শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

আরেক সকালের কাহিনী

 শুক্রবার গুলি ডিলিট করে দিতে ইচ্ছা হয়। জীবনে না থাকলেই ভাল হোত।

আচ্ছা, এই যে আমি সারারাত ডিউটি করে, সকালে প্রচন্ড মাথাব্যথা আব বমি লাগা নিয়ে টলতে টলতে বাসায় ঢুকলাম, লোকটা একবার জিজ্ঞেস করতে পারল না, কেমন গেল নাইট ডিউটি? খুব খারাপ লাগছে নাকি? মুখটা এমন লাগছে  কেন? বা দশ মিনিট একটু ঘুমাও এখন অন্তত? বা মাথায় বিলি কেটে দিব?
বা শুধু শুকনা মুখেই- কেমন আছ? বা দেরি হোলো কেন? আচ্ছা এইসব কিছুই না, পশ্চিমা একটা হাই?

কিচ্ছুনা

কোনমতে দরজাটা খুলে দিয়ে সে ঘুমগ্রস্থ মানুষের মত আবার ঘুমাতে চল্ল। সারারাত কিন্তু সে ঘুমিয়েছে বাসায়। আমি ছিলাম হাসপাতালে। দুইটা ছোট ছোট বাচ্চা ছাড়া কেউ নাই বাসায়। ইতিমধ্যে ছোটজন উঠে গ্যাছে। হাসপাতালে পরে থাকা কাপড় গায়েই ওকে জড়িয়ে ধরলাম। কারণ আর কেউ নেই ওকে ধরার, দাঁত মাজানোর, খাওয়ানোর, বা শুধু বলার, যে, মা রে, একটু দুইটা মিনিট শান্ত থাকো, তোমা মা অনেক ক্লান্ত।

আমার হাসবেন্ডকে জোর করে ধরে রাখলাম, আমার পাশে একটু বস, প্লিজ, আমি মাথা নিয়ে উঠতে পারছিনা। জোর করে ওর হাত টেনে আমার কপালে চাপা দিয়ে রাখলাম। একটু বস প্লিজ। আমার কথা বলতেও খারাপ লাগছে

সে মোচড়া মোচড়ি করল, খুবই বিরক্ত লাগছে ওর। 'হাত ছাড়, আমি কি করব?' 'ধরে থাকলাম তো,' সে বলছেই। কয় সেকেন্ড ছিল তোমার হাতটা আমার কপালে? দশ? বারো? আঠারো? ছেড়ে দিলাম। আচ্ছা যাও।
ও পাশ ফিরে কম্বল মুড়ি দিয়ে মাথা পর্যন্ত ঢেকে ঘুমিয়ে পড়ল। এক সেকেন্ডে বা তার চেয়েও কম সময়ে কি কেউ সত্য ঘুমিয়ে পড়তে পারে? আমার বিদ্যা তো বলে- 'না'। কিন্তু ওর এই কম্বল মুড়ে শোয়ার সাথে সাথে আমাকে ধরে নিতে হবে, ও এক্ষনই ঘুমিয়ে পড়েছে, বা এখনো ঘুমাচ্ছেই ।। কোন শব্দ বা বাসার কোন কিছুর সাথে -এখন আর ওর কোন যোগ নেই।
বাচ্চা কে ধরবে? বাজার কি আছে? কাপড় গুছানো -ধোয়া বা রান্না বাআর কোন কিছু--  মেহমান বা দাওয়াত -- এখন পৃথিবীতে এইসব কিছু নেই।

আমার খুব অভিমান হোলো। গলার কাছে কান্না জমে গেল। এইটুকু স্পর্শ আমাকে কত ছোচলামি করে আদায় করে নিতে হয়? এতটুকু  এটেনশন কি আমি পেতে পারিনা আমার সবামীর কাছ থেকে?-- যে আমার আজ খুব অসুস্থ লাগছে? এটা শুধু আজ সকালের ঘটনা না। এটা প্রতি নাইট থেকে ফিরে আসার পরের ঘটনা। এটা আমার গত আট বছরের প্রতিদিনের ঘটনা। হ্যাঁ, এর পরেও আমি এই অবহেলায় অভ্যস্ত হতে পারিনি।
মনের এক অন্ধকার কোণায় সত্যি আজ একটা খুব বাজে কথা মনে হয়েছে। সত্যি। আমার ব্লগটাকে অতিসস্তা কোন অশ্লীলতা দিয়ে কলুষিত করতে চাইনা, শুধু এক মুহূর্তের জন্য যে বাজে কথাটা উঁকি দিয়েই মিলিয়ে গেল, সেই সত্যিটা লিখতে চাই, সেটা হল, সব পুরুষের স্পর্শ ই কি একই রকম? ওর হাত না হয়ে অন্য যেকোন পুরুষ আমার কপাল আর এক চোখে তার হাতের তালু চেপে রাখলে কি আমার এই একই রকম লাগবে? 

মিনিট পাঁচেক মরার মত পড়ে থাকলাম। ছোটজন খুব বিরক্ত করছে।ওর বোধহয় ক্ষুধা পেয়েছে। বড়জন উঠেছে, ওর ব্রাশেও পেস্ট লাগিয়ে দিতে বলছে। নাস্তা বানানো আছে, বুয়া এসে বানিয়েছে, কিন্তু ওদের নিয়ে খেতে বসতে হবে, না হলে না খেয়েই ওরা কার্টুন দেখতে শুরু করবে।

ও হ্যাঁ আমি আমার গাইনি ব্লগের জন্য আকটা লেখা লিখছিলাম আর সেটা টাইপ করে ল্যাপটপে উঠাতে আমার কিছুক্ষণ সময় লাগবে। আমি অনেক দ্রুত টাইপ করতে পারি। বিশ মিনিট এনাফ। কিন্তু আমি লিখতে পারছিনা। দুইবোন মারামারি করছে। হাজবেন্ড পাত্তা চাচ্ছে নাস্তা করতে বসে। আমাকে কি যেন জিজ্ঞেস করেই সাথে সাথে রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে তাকিয়ে বল্ল, চা কি আছে? চা বানাতে উঠলাম। না আমরা কখনো গল্পন করিনা। অতএব আমি উত্তর না দেয়াতে তেমন কোন সমস্যা হোলোনা

বাপি নামাজ পড়ে কি মনে আমার বাসায় এসেছে, বল্ল বুড়ি প্রেসারটা মাপ তো। আমার উনি আজ নামাজে যান নাই। জানিনা কেন। যদি গোসলের পানি রেডি না থকত, যদি আমি মার্কেটে যেতে চাইতাম বা আমার খালার বাসায় দাওয়াত, তাহলে তার মসজিদে যাওয়া চাই ই চাই। আজ যাওয়ার দরকার পড়েনি।

প্রেসার মাপতে গিয়ে দেখি, মেশিন নষ্ট। আমি অবাক গলায় বলে উঠলাম, আরে মেশিন কবে নষ্ট হোলো আবার?
আমার এত্ত ক্লান্ত লাগছে। আমি নিজেই দেখেছি আমার চোখ দুইটা লাগছে কিডনি রোগীর মত। বাপি চোরা চোখে আমাকে দেখছে, কেমন আছি এখনো জিজ্ঞেস করেনি, খুব হাল্কা গলায় করবে এখনই, অন্য কোন কথা খুঁজছে।

আমার উনি টিপ্পনী কেটে বল্ল, --মেশিন তো নষ্টই হবে! বাচাদের খেলার জন্য ফেলে রাখছ। প্রতিদিন ওরা এইসব মেশিন নিয়ে খেলে।
আমি কেন ওদের মেশিন দিয়ে খেলতে দিব? ওরা সত্যি খেলে? তুমি দেখেছ? উঠিয়ে রাখোনি কেন তাহলে?

-আমি কি ঊঠাবো? তুমিই তো খেলতে দিছ
আমি ছুড়ে ফেলে দিয়েছি মেশিন, লাগবেনা আমার কিছু। এইসব ডাক্তারী মেশিনপত্র দিয়ে কি করব আমি?
ও বল্ল, আর কি পারবা তুমি খালি ফেলতে পারবা জিনিস
আমার আব্বা উঠে চলে গেল। আমি তখন চিবিয় চিবিয়ে বলছি, কি করতে পারব আমি তুমি কি জানো? তোমার কোন ধারণাই নাই আমি কি করতে পারি। কি জানো তুমি?

সারাটা দিন আমার বুকের ভিতরটা খালি জ্বলছে। কিভাবে এত বড় ভুল করলাম আমি? মানুষের মুখের কথায় কেন গলে গেলাম? এত বড় গাধা আমি। অবশ্য সবার সব কথাই আমি বিশ্বাস করার জন্য হা করে বসে আছি। যেমন গতরাতে, আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম, ক মনে করে আমার পতিদেব আমাকে দুইটা ভালো কথা বলেছিলেন, বলেছিলেন, যে আমার কথা মাঝে মাঝে যখন ওর মনে পড়ে, তখন নাকি ওর বুকের ভিতর হাহাকার করে উঠে। আমাকে এত্ত ভালোবাসে সে। কথাটা শোনামাত্র বিশ্বাস করেছিলাম।

এখন মনে হচ্ছে, এই কথাটাও আসলে ভুয়া ছিল। আর সেটা ধরতেও আমার সারা সকাল পার করতে হল। দরজা খোলার সাথে সাথেই আমার বুঝে ফেলা উচিত ছিল। অথবা কলিংবেল টিপে মিনিট দশেক হাবার মত দাঁড়িয়ে থাকার সময়টাতে। অন্য সকাল গুলোর মতই।