শাম্মা-র ভালোনাম বুঝি
‘হাসিনা আক্তার’?! আক্তার, বেগম, খাতুন নামগুলো এখন দেখাই যায়না। পুরনো ধরণের নাম
কিনা। শিল্পী আজীবন তার নাম নিয়ে হীনমন্মতা্য ভুগেছে, কারণ তার নাম শিল্পী বেগম। অনেকের
হাসির পাত্র হয়েছে আজীবন। স্কুলে তারেক, অপু আর দু-একটা ছেলে ছিল, যারা ওকে
আর্টিস্ট বেগম ডাকত। ক্লাস এইটে একটা নতুন
ছেলে যখন ভর্তি হল রহিম বাদশা নামে, তখন অপু-রা ‘বাদশা বেগম’ এমন কিছুদিন খুব
ভেঙ্গাতো। তারপর ভুগোল ক্লাসে একদিন শিল্পী
শব্দ করে কেঁদে ফেলেছিল আর স্যারের হাতে অনেক মার খেয়েছিল কয়েকজন। বছরের মাঝখানে
আবার রহিম উধাও হয়ে গেল, মানে স্কুল বদলালো। শিল্পী বৃত্তি পরীক্ষায় সারা জেলায়
প্রথম হল। অনেক কিছু বদলে গেল। অপু, তারেক আর কখনো শিল্পী-কে ‘আর্টিস্ট বেগম’ নামে
খেপায়নি। এখন হয়ত শিল্পীকে তার পুরো নাম ধরে পরিচয় দিতে পেরে গর্বই করবে ওরা, মাঝে
মাঝে মনে হয় শিল্পীর। কারণ অপু রা ঝরে গিয়েছিল, কোথায় কি করছে জানেনা, আর শিল্পী-
এত টুকু ভেবে আবার
থেমে গেল শিল্পী। না তাকে আলাদাভাবে পরিচয় দেয়ার মত এখনো কিছু হয়ে যায়নি সে। ভালো
ফল করে এম,বি,বি,এস পাশ করেছে সে, ঠিক আছে, কিন্তু তার নাম ধরে খুঁজে বেড়ানোর মত
অবস্থানে, এখনও সে যায়নি।
কে জানে, হয়ত কখনো সেই
অবস্থানে যেতেই পারবেনা শিল্পী। আজীবন সংগ্রামই করে যেতে হবে!
শাম্মা আবার মেসেজ
পাঠিয়েছে, ক্রিং করে মেসেঞ্জারে একটা শব্দ হল-
আপি?
শাম্মা-র ফেসবুক নাম ‘শাম্মা
নীলপরী’ খুব স্টাইলিশ আর আপ্টুডেট মেয়েটা। সে তার বিয়ের কার্ড পাঠিয়েছে, ছবি তুলে,
মেসেঞ্জারে। এই শুক্রবার বিয়ে। শিল্পী কি মনে করে ছবিটা জুম করে শাম্মার নাম
দেখছে। কোথায় কখন যেতে ভালো করে লক্ষ্য করেনি, কারণ এই শুক্রবার ওর ছুটি নেই। যেতে
পারবেনা।
কার্ডে শাম্মার নাম
লেখা ‘কনেঃ হাসিনা আক্তার।‘ নামের আগে ডাঃ; কথাটা লেখা নেই। শাম্মা পাশ করে
বেরিয়েছে আট মাস হবে। এই কদিন আগেও ইন্টারণী হিসাবে প্লেসমেন্ট ছিল শিল্পীদের
ইউনিটে। ডাঃ লেখেনি কেন? পাত্র কি করে?
শাম্মা আবার মেসেজ
পাঠিয়েছে। আবার কার্ডের ছবি।
শিল্পী উত্তর লিখল,
কংগ্রাচুলেশনস!
একবার মনে হল বলে,
তোমার হবু বর কি করে?
তারপর কি মনে করে
জিজ্ঞাসা করলনা। সামনা সামনি হলে জিজ্ঞাসা করা যেত। মেসেঞ্জারে এত কথা লিখতে ভাল
লাগেনা।
আরিফও শিল্পীর নামের
আগে ডাঃ; লিখতে চায়নি। বিয়ের কার্ডে। আরিফের বাবা শিল্পীর বাবা মা আর শিল্পীর
নামের বানান নিয়ে গেল। বাবা বড় বড় করে শিল্পীর নামের আগে ‘ডাঃ’ লিখে দিল। আরিফ ফোন
করল শিল্পীকে। আমি ‘ডাঃ’ কথাটা দিতে চাচ্ছিনা কার্ডে।
কেন?
এটা তো তোমার নাম না
তাইনা। এটা পদবী।
এটা তো নামের আগেই
বসে।
কিন্তু আমার কেমন যেন
লাগছে শব্দটা। শুধু নামটা দিলে হয়না?
কেন? তুমি কি লজ্জিত?
আমার নাম নিয়ে? না পদবী নিয়ে?
না থাকলে সমস্যা কি?
থাকলে কি সমস্যা আমি
তো সেটা বুঝতে পারছিনা।
থাকলে কেমন অহংকারী
দেখায়। আমি অহংকারি পছন্দ করিনা।
-বুঝিনাই
মানে, সবাইকে বলা ,
দেখো আমার বউ ডাক্তার। আমার অসুবিধা লাগছে, আর আমার অফিসে এমন একটা কাহিনী আছে। এক
ভাই কে নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছিল, আমার ভাল লাগেনা
কয়দিন ধরে এই দিকেই
আলাপ চলে যেত। ফোনে। আরিফ ‘ডাঃ’ লিখবেনা কার্ডে। শিল্পীও তখন নতুন ডাক্তার।
এমনিতেও বাস্তব বোধ কম। আরিফ যে তার পেশা সম্বন্ধে গভীর করে কিছু জানেইনা, শিল্পী
আঁচই করতে পারেনি। তখন শুধু তর্ক করেছিল পদবী নিয়ে। এটা নাম না তাহলে নামের আগে
বসাতে হবে কেন? এই প্রশ্নে শিল্পী চুপ করে থাকত।
শাম্মা-র বেলাতেও কি
এমন হচ্ছে? ওর বরের নামের আগেও পদবী লেখা নেই। সে কি শাম্মার নামের আগে ‘ডাঃ’
লিখতে না করেছে? এটা কি ছেলের বাড়ির কার্ড?
শিল্পীর বাবার কানে
আসল, আরিফ ডাঃ লিখতে চাচ্ছেনা। রাশভারী মানুষটা চুপ হয়ে গিয়েছিল। মা বল্ল, লিখবেনা
কেন? তুই কি বলিস?
‘আমি খুব বিরক্ত’ বলা
উচিত ছিল। শিল্পী কি বলেছিল? গাধার মত নিশ্চয়ই বলেছিল, ‘না লিখুক, আমার কোন
অসুবিধা নাই’?
এমনই কিছু বলেছিল
সম্ভবত। মনে নাই।কার্ডের ছবি স্ক্যান করে রাখা আছে কম্পিউটারের কোন কোনায়। খুঁজে
দেখতে হবে। অবশ্য এখন আর দেখে কি হবে?
এই যেমন শাম্মাকেও
বলার কোন দরকার নেই, ‘এই যে পদবী লিখতে দেয়নাই, এর মানে কি, জানো? এর মানে খুব
ভয়াবহ। মানে তুমি ঢালু পথে পা রেখে দিয়েছ। সেই ঢালু পথে পা হড়কে কোন অচেনা
অন্ধকারে তুমি গিয়ে পড়বে তার কি কোন ঠিক আছে? কার্ডে ছাপায়নি, ভাল কথা। প্রতিটা
কার্ডে তুমি রুপালী কালী দিয়ে তুমি তোমার পদবী জুড়ে দাও। পৃথিবীটা খুব খারাপ জায়গা
মেয়ে। নিজেকে নিজে প্রতিষ্ঠা না করলে তুমি নিঃশেষ হয়ে যাবে, উধাও হয়ে যাবে, বিলীন
হয়ে যাবে, নাই হয়ে যাবে
শিল্পীর মাথা দপ দপ
করছে। অবধারিত ভাবে তার মাথার ভিতর এখন ঘুরতে থাকবে না বোধক সব প্রতিশব্দ। একটু পর
শুরু হবে মাইগ্রেনের তীব্র ব্যথা।
ক্রিং করে আবার শব্দ
হল, মেসেঞ্জারে, শাম্মা লিখেছে,
থ্যাংকস আপি!
দোয়া করবেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন