বুধবার, ১১ জুলাই, ২০১৮

ঐশ্বরিয়া


ফররুখ আমার কথা আমার সুরেই রিপিট করে বল্ল, এটা কি নুডুলস?
ঠিক আমার সুরেই না, আর একটু সুর বেশি করে লাগিয়ে, অনেকটা গানের মত শোনাল ওর কথা। সে হেসেই যাচ্ছে।
হিহিহি হিহিহি।
আমি লজ্জিত মুখে বললাম, হাসির কি আছে? হাসো কেন?
সে আবারো আমাকে ভেঙ্গাতে লাগল, এটা কি নুডুলস? এটা কি নুডুলস?
তার হাসির সাথে আমাদের দুইকন্যাও যোগ দিল।বড়কন্যা মানহা বল্ল, মা তুমি না বোকামি কর।
ছোটজন, মুনতাহা বল্ল, কি বোকামি আপু?
বাবা, ফররুখ, বল্ল, তোমাদের মা বোকামি করেনাই, ভুলে বাংলায় জিজ্ঞেস করে ফেলছে,এটা কি নুডুলস? ওরা তো মালয়েশিয়ান,তাইনা?
ওরা বাংলা বুঝেনা।
মুনতাহা বল্ল, ইয়াল্লা, ওরা চাইনিজ কথা বলে?
ফররুখ বল্ল, না। ইংরেজি বুঝে।
মানহা বল্ল, মা তুমি বলবা, excuse me, is it noodles?
চারসদস্যের এই বাহিনী আমরা এইবারই প্রথম দেশের বাইরে বেড়াতে এসেছি। গতরাতে এগারোটায় রওনা দিয়ে পৌছেছি কোয়ালালামপুরের সময় ভোর পাচটায়, মানে ঢাকায় তখন
রাত তিনটা বাজে। চোখ বড় বড় করে বিদেশ দেখছি, বিদেশি মানুষ দেখছি, ঝকঝকে এয়ারপোর্ট দেখছি। মাঝে মাঝে ঘোষণা হচ্ছে, অমুক প্লেনের যাত্রীদের অমুক গেটে যেতে বলা হল।
এয়ারপোর্ট পুলিশের একজন আমাকে বলেছিল যেন গেট নাম্বার খেয়েল করে শুনি, তাই প্রতিটা ঘোষণাই না চাইতেও  শুনেই ফেলছি। আমরা আজ আর কুয়ালালামপুর ঢুকবনা। কাগজপত্র বুঝে নিয়ে ওদের ডমেস্টিক রুটে যাব লংকাউই দ্বীপে। চারদিকে নানান ডিরেকশন, নানা জিনিস লেখা থাকা সত্ত্বেও কাগজ বুঝে নিতে এখান থেকে সেখানে, উপর থেকে নিচে, নিচে থেকে উপরে কয়েকবার হাটাহাটি ঘুরাঘুরি করেছি। একদফা tandas মানে ওয়াশরুমে গিয়েছি, আর একটা নতুন শব্দ শিখে ফেললাম keluar, মানে exit.
এয়ারপোর্ট ভর্তি নানা ধরণের দোকান। চকলেট, পারফিউম, ব্যাগ, পুতুল, কফিশপ, নানান বিখ্যাত ব্র্যান্ড। চকলেটের দোকানের চারদিকে মিষ্টি মৌ মৌ গন্ধ।পুতুলের দোকানে ইয়া বিশাল টেডি দেখে আমিও বাচ্চাদের সাথে গলা মিলিত আহা উহু করলাম। নয়ত বায়না ধরে এত বড় টেডিবিয়ার এখনই কিনে দিতে হবে।
তখনো চারদিকে আলো ফুটেনি, কিন্তু আমাদের ক্ষুধা পেয়ে গেল। পরের ফ্লাইট দেরি আছে। ঢুকলাম এক ফাস্টফুড দোকানে। ওদের লোকাল ব্র্যান্ড, ইংরেজি হরফে খাবারের মালয় নাম আর ছবি দেয়া। আমি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর বারগার ছাড়া কিছু বুঝতেছিনা যে কোনটা কি খাবার।
খাবারের লাইনে বোকার মত কতখন দাঁড়িয়ে থেকে অরডার নিতে থাকা মালয় মহিলাকে মনের ভুলে জিজ্ঞেস করে ফেললাম, বাংলায়, আচ্ছা এটা কি নুডুলস?
মহিলা পাখির মত মাথা নেড়ে নেড়ে বল্ল, noodles! noodles! hot and spicy noodles!
ফররুখের হাসি শুরু হল। আস্তে করে বল্ল, বাংলা?
আমি জোরে করে বললাম, one noodles please.
কিছুখন পর নুডুলস আসল। গোল বড় বাটিতে লাল টকটকা ঝোলে মোটা মোটা লম্বা লম্বা নুডুলস একগাদা। আমরা চার সাওদস্যের পুরা বাহিনীও এই নুডুলস খেয়ে শেষ করতে পারবনা।
একে ওকে সাধি, নুডুলস খাও, কেউ খায়না। অতএব আমি একাই নুডুলস শুরু করলাম।
লাল টকটকা ঝাল সুপ। ঠোঁট পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু নুডুলসে কোন লবণ ঢুকেনি। বাঙ্গালী রসনায় একে বলে 'পানসে', আমার নানী বলত, 'আইল্ল্যা', আর আমি বিষম খেতে খেতে বলতে চাইলাম, 'বিচিত্র!!'
কিন্তু বাহিনীর সামনে আরো বেশি হাস্যকর হতে চাইনা, অতএব কবি এখানে নীরব অবস্থা।
ফররুখ বল্ল, কেমন? খেতে পারছ?
ঝাল।
আমি ছোট ছোট করে খাচ্ছি, অত্যন্ত অনাগ্রহে, দেখে বল্ল, অন্যকিছু নিবা?
আমি হাম দিল দে চুকে সনম সিনেমায় চলে গেলাম।
কালো নেটের শাড়ি, লম্বা মঙ্গলসুত্র পরে, কপালে উচু করে ছোট একটা কালো টিপ আর লালচে বাদামী
লিপ্সটিক ঠোটে, উদাস কিন্তু ম্যাজেস্টিক ভাবে ইটালিয়ান স্ট্রিট রেস্টুরেন্টে বসে আছে মিস ওয়ার্ল্ড, ঐশ্বরিয়া রাই। সাদা স্যুট পরে এসেছে অজয় দেবগণ। অজয় অর্ডার করল, one sandwitch and coffe.
বয় জানতে চাইল madame কি same নিবে?
অজয় বলতে গেল, same.
ঐশ্বরিয়ার ধ্যান ভাঙল। অজয়ের সেম সেম খাবার সে খাবে? হতেই পারেনা। সে মেন্যু উলটে কিছু না দেখেই না বুঝেই বল্ল, number 13
mamammiya! mammamiya! করতে করতে বয় চলে গেল। কিছুখন পর নিয়ে এল শাকপাতা আই মিন লেটুস দিয়ে সাজানো ইয়া বড় ডিস, শামুক টামুক কি কি যেন ছিল।
জেন্টেলম্যান অজয় তার স্যান্ডউইচ এগিয়ে দিল।
ঐশ্বরিয়া কাটা চামচ দিয়ে শামুক বাছতে লাগল।
u dont have to eat this Nandini.
ঐশ্বরিয়া কাচামরিচ খাওয়া শুরু করল। তার চক্ষু লাল হয়ে গেল। পিছনে 'লে যা তুউউ--উনে' সুর দিয়ে বিরহের গান শুরু হল।
অজয় বল্ল, dont create a scene Nandini, drink this water
ঐশ্বরিয়ার গাল বেয়ে পানি পড়ছে সে একের পর এক কাচামরিচ খাচ্ছে, তার সাথে সাথে দরশকও (মানে আমি) কানতেছি।
এই সিন মনে পড়ে এখন আমার দম ফেটে হাসি আসতে থাকল। আমি প্লাস্টিকের কাটাচামচ দিয়ে ঝোলের ভিতর নুডুলস পেচাতে পেচাতে হাসি কোনরকমে আটকে রেখে বললাম,
কেমন যেন নিজেকে ঐশ্বরিয়া  ঐশ্বরিয়া  লাগতেছে
ফররুখ সিনেমা টিনেমা দেখেনা। বল্ল, হুম?!! ( মানে কি বল বুঝিনা)।
আমি হাসি আটকে রাখতে পারছিনা, আমারো চক্ষু দিয়ে পানি পড়ে পড়ে অবস্থা, সে বুঝল, বিষয়টা নুডুলস ঘটিত, বল্ল, এইটা রাখো তো, দাঁড়াও বারগার নিয়ে আসি আরেকটা।
#মালএয়িশা__ট্যুর
#noodles
#ঐশ্বরিয়া

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন