দরজায় টোকা দিয়ে বাইরে
দাঁড়িয়ে আছে বদরুল আলম। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ।দরজার নিচের চিকন ফাঁকা অংশ দিয়ে দেখা
যাচ্ছে, ভিতরটা অন্ধকার। বদরুল আলম হাতের কব্জি উলটে ঘড়ি দেখল। বিকাল চারটা
তেইশ। অসময় হয়ে গেল বুঝি। আরেকটু আগে বা পরে আসা উচিত ছিল। আপারা এখন বোধহয়
বিশ্রাম নিচ্ছে। বদরুল আলম ইতস্তত করতে থাকল, থাকব নাকি চলে যাবো?
হাত থেকে ভারী ব্যাগটা
নিচে মাটিতে নামিয়ে রেখে মনে মনে বল্ল বদরুল, এখন ছাড়া সময় নেই। হিসাবপত্র পুরোটাই
বাকি। সন্ধ্যার পর রিপোর্ট নিয়ে বসতে হবে। আটটা পর্যন্ত হিসাব। তারপর ছুটি।সাড়ে
নয়টায় বাস ছাড়বে ।হিসাব শেষ না করে বাড়ি যাওয়া যাবেনা। আচ্ছা আজ কোন কোন আপার
ডিউটি?
দরজা একটু ফাঁকা করে
উঁকি দিল একটা মুখ। গম্ভীর গলায় শুধু বল্ল, দাঁড়ান।
উঁকি দিয়েছে মিতা আপা।
বদরুল আলম পুরোপুরি নিভে গেল।মিতা আপা একটু অন্য রকম। প্রয়োজনের বাইরে একটা কথাও
বলেননা। বদরুল এসেছে কোম্পানির সবচেয়ে দামি এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন নিয়ে কথা বলতে।
বিক্রি বাট্টা নেই।মিতা আপাকে এইসব বলে কোন লাভ নেই।বলার কোন সুযোগই দিবেননা আপা।
উনি হু হ্যাঁ করে কিছুক্ষণ কথা শুনবেন।কিচ্ছুটি বলবেন না। কথা শেষ হলে বলবে, ঠিক আছে ভাই? কথা শেষ?
আল্লাহহাফেজ?
বদরুল আলম নিচু হয়ে
ঝুঁকে ভারী ব্যাগটা হাতে নিল।ফিটফাট করে পরে থাকা শার্টের কলার অভ্যাসবশত ঠিক করল,
তারপর ঢুকল ডিউটি ডাক্তারদের রুমে।
মিতা আপা রুমের লাইট
জ্বালিয়েছেন। বদরুল মুখে একটা নকল হাসি টেনে বল্ল, আপারা বোধহয় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন?
মিতা ভুরু কুঁচকে বদরুলের
চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন।বলতে চাচ্ছে যেন, ‘বিশ্রাম নিচ্ছিলাম না কি তাত আপনার কি
দরকার?”
বদরুল থেমে গেলেন, না
হলে মুখে এসেই গিয়েছিল, আমি খুবই স্যরি আপা, হয়ত অসময়ে বিরক্ত করলাম।
মিতা চেয়ার টেনে বসেছেন।
সামনে একটা চেয়ার খালি। কিন্তু বদরুল কে বসতে বলেননি। বদরুলের সাহস নেই নিজে থেকে
উনার সমনে চেয়ার টেনে বসার। ভদ্রমহিলা খুবই রাগী। রাগ দেখান না, বকা বাদ্যি করেন
না, গম্ভীর। উনার চোখে বা চেহারায় বা ভুরু কুঁচকানোতে কিছু আছে।
আপা, বদরুল আলম, সিমোরা
ফার্মা।
হুম।
আপা আজ কয়জন আছেন
ডিউটিতে?
চার।
বদরুল চোরা চোখে রুমে
নজর বুলালো, আর কেউ নেই। অন্যদের বেলায় বদরুল তরল গলায় বলে, অন্য আপারা কই?ওটি আছে
অনেক? রুগী কি খারাপ আছে নাকি? অনেক চাপ যাচ্ছে, না?’ বলতে বলতে চেয়ার টেনে বসে।
তারপর গলায় একটা উদাসভাব নিয়ে এসে বলে, ‘আপারা তো ভুলেই গেছেন আমাদের!’
বদরুলের কথার
ভান্ডারে শর্ট পড়ে যাচ্ছে।কি বলা যায় এই দাম্ভিক মহিলা কে। যেকোন ভাবেই হোক
আলাপচারিতা এন্টিবায়োটিক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। নামটা যদি অন্তত একবার মাথায় দিয়ে
দেয়া যেত, বদরুলের কাজ অনেক সহজ হয়ে যেত।
খালি চেয়ারে ভারী ব্যাগ
রেখে সে ওষুধের স্যাম্পল আর কাগজপত্র বের করে রাখতে থাকল।চার সেট করে সাজিয়ে রাখছে
সব টেবিলে। তোতা পাখির মত ওষুধের বর্ণনা দিতে থাকল। মিতে ভাসা ভাসা চোখে পাশের
দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে।দেয়াল জুড়ে নানান কাগজ, নোটিশ, পোস্টার, ফোন নাম্বার, ডিউটি
রোস্টার।মিতা সেসবই দেখছে।বদরুলের একটা কথাও তার কানে যায়নি।
আপা, একটু দেখবেন প্লিজ।
দশ মিনিটের বক্তব্য কোনমতে দুই মিনিটে শেষ করল বদরুল।
মিতা একই শব্দ করল, হুম।
ধুর আজকের ভিজিটটাই মাটি
গেল।এখনই নিশ্চয়ই মিতা বলবে, ঠিক আছে? কথা শেষ?
বদরুল তাড়াতাড়ি ব্যাগের
চেইন লাগাতে শুরু করল।এই তিন বছরের চাকরি জীবনেও এভাবে কেউ বের হয়ে যেতে বললে সেটা
সহজভাবে হজম করতে পারেনা সে।
ব্যাগের চেইন কিসে যেন
আটকে গেছে। বলে না, তাড়াহুড়ার কাজ ভালো না। দুনিয়ার ওষুধ-পত্রের স্যাম্পল আর কাগজে
ঠাসা ব্যাগ। বদরুল ব্যাগের চেইন ধরে হ্যাঁচকা টান দিচ্ছে। এতে চেইন আরো বেকায়দা
হয়ে আটকে যাচ্ছে। একে এন্টিবায়োটিকের কথা তোলা গেলনা, তার উপর এখনের এই বিব্রতকর
অবস্থা, নিজের উপরই বিরক্ত লাগছে তার।
মিতা তার হাতে একটা কলম
ঘুরাচ্ছে। কে জানে হয়ত খুব বিরক্ত হচ্ছে? এখনই বল্ল বোধহয়, ভাই? ঠিক আছে তাহলে?
মিতা হিজিবিজি কগজে ঢাকা
দেয়াল থেকে চোখ সরিয়েছে। এখন স্যাম্পল আর লিটারেচারের কাগজপত্র দেখছে।
বদরুল এন্টবায়োটিকের কথা
বলতে শুরু করল। আপা, আমাদের এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন নিয়ে খুব বিপদে আছি, আপনারা যদি
একটু না দেখেন, মানে, আসলে
মিতা ঘুমের ওষুধের
স্যাম্পল টা হাতে নিয়ে হঠাত বলে উঠল, স্লিপকুল?
জ্বি আপা, আমাদের নতুন প্রোডাক্ট
কেমন? ভালো
অবশ্যই আপা। আমাদের ‘র’
ম্যাটেরিয়াল আসে
এক নিঃশ্বাসে বলছে
বদরুল। মুখস্ত। তাকিয়ে আছে মিতা আপার চোখের দিকে। মিতা আপার চোখের পাতা গুলো ফোলা
ফোলা দেখাচ্ছে। আপা কি অসুস্থ নাকি? জিজ্ঞেস করবে নাকি একবার?
মিতা আবারো জিজ্ঞেস
করছে, কাজ হয় ভালো?
বদরুল বিপদে পড়ে গেল।
একই কথা আবার বলবে সে?
কিন্তু মিতার গলার স্বর
এখন কেমন যেন মরা মরা শোনাচ্ছে। রাগ বা বিরক্তি কিছু নেই। যেন খুব ক্লান্ত সে।
এমনভাবে ছোট্ট চারকোণা বাক্সটা ধরে আছে, যেন এর মাঝে শান্তি ভরা আছে।
আপা, আপনার লাগলে দিয়ে
যাবো আরো
মিতা সম্বিত ফিরে পেল।
ভুরু আবার কুঁচকে গেছে । কড়া চোখে তাচ্ছিল্য নিয়ে তাকালো বদরুলের দিকে। তার চোখের
থেকে চোখ সরিয়ে নিল বদরুল। বেয়াদবি হয়ে গেল বুঝি।
কড়া গলায় বলল মিতা, আপনি
এই ড্রাগের কাগজপত্র দিয়ে যেয়েন তো? প্রেগঅন্যান্সিতে কি সেফ? কোন ক্যাটাগরি?
বলতে বলতে দুই আঙ্গুলে
অদ্ভুত ভাবে একটা টোকা দিয়ে ঘুমের ওষুধভরা কাগজের বক্সটা ছুড়ে দিল টেবিলে।
বদরুল জ্বি আপা, জ্বি
আপা বলতে বলতে চেইন নষ্ট ওষুধেরর ব্যাগ নিয়ে দ্রুত পায়ে বের হয়ে আসল ডিউটি রুম
থেকে।
[photos ource: internet]

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন