শুভ বারবার মিতাকে
বলেছে, তোমার রুপপুর আসার দরকার নেই। অবশ্য ঠিক স্বাভাবিক গলায় বলেনি। বলেছে একটু
ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে। বলার জন্যই বলা। ঈদের একটাই বড় ছুটি। মিতা তার সাথে না গেলে খারাপ
দেখায়। কিন্তু মিতাকে ইদানিং সরাসরি কিছু বলা যায়না। শুভ পারেনা। খুব বাজে ঝগড়া
শুরু হয়ে যায়। মিতা খুব ধারালো কথা বলে ইদানিং। আর সারাখন ভারী কাঁচের চশমা
পরে থাকে । চশমার ওইপাশে চোখে বিষাদ না হতাশা খেলা করে,না ঘৃণা, সেটা দেখার মত
যথেষ্ট সময় নেই শুভর।দরকারও নেই। সে শর্ট-কাটে শুধু বলেছিল, কবে যাবো আমরা?
কোথায়?
মিতা খুব শান্ত গলায় কথা
বলে ইদানিং। কিন্তু সেই শান্ত স্বর শুভর কাছে উন্নাসিক শোনায়।
কোথায় আবার? অবশ্য তুমি
যেতে না চাইলে বাদ দাও। আমি যাবো।
ওর চিবিয়ে চিবিয়ে কথা
বলার ধরণে মিতা ততখনে বুঝে গেছে শুভ কোথায় যাওয়ার কথা বলছে। মিতা চোখের সামনে আবার
বই ধরল। শুভ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বল্ল, নাবিলা কিন্তু যাবে আমার সাথে
মিতা হাল ছেড়ে দেয়া
মানুষের মত বল্ল, কবে যাচ্ছ?
কিন্তু মিতার কথার হাল
ছেড়ে দেয়া সূরটা শুভর কাছে ঔদ্ধত্য লাগছে।
আমাকে একটু আগে যেতে
হবে। আমি কালই যাচ্ছি।
শুভর মনে হচ্ছে ওরা বুঝি
ঝগড়া করছে। এবং এই ঝগড়ায় ওর জিততে হবে। আসলে মিতার সাথে ইদানিং আর গল্প বা আলাপ
করা যায়না। চলে সিদ্ধান্তের লড়াই। সেই শীতল দীর্ঘ লড়াইয়ে খুব ক্লান্ত বোধ করে দুই
জনই।
মিতা বলছে,’নাবিলার
স্কুল তো এখনো খোলা‘
‘ঈদের দুইদিন আগে ওর এত
ক্লাস করার দরকার নেই।‘ বিড়বিড় করে বল্ল শুভ। ওর ফোন বাজতে শুরু করল। ও ফোন রিসিভ
করে বারান্দার দিকে এগুতে এগুতে শুনল, মিতা বলছে, আমারো ডিউটি আছে।
এখন কথাগুলো কানে বাজছে
শুভ-র। মিতা ওর পাশেই রিক্সায় বসা। রুপপুর এসেছে মিতা। নাবিলাকে নিয়ে। ডিউটি বদলে।
কিন্তু মিতার যা স্বভাব। কারো সাথে ঠিকমত কথা বলছেনা সে। আত্মীয় স্বজন ভরা গমগমে
মজলিসে কথার মাঝখানে , উফ মাথা ধরেছে বলে উঠে চলে যাচ্ছে ঘরে। এমনকি বিকালেও ঘর
থেকে বের হয়নি। শুভর বড় ভাবি আস্তে করে শুভকে বলেছে শুধু, জোর করে নিয়ে এসেছ কেন?
কি বেইজ্জতি। শুভ তো
বলেইছিল, আসতে হবেনা। যদিও মনে প্রাণে ঠিক চাচ্ছিল, মিতা কে যেতেই হবে।
ঈদ শেষ। পরশু থেকে অফিস।
মিতার বোধহয় তার আগেই ডিউটি পড়েছে।মানে ঈচ্ছা করেই ডিউটি নিয়ছে সে নিশ্চয়ই, ভাবল
শুভ। কিছুতেই শুভর বাড়ির কারো সাথে মিশতে পারেনা মিতা। নিজেকে না জানি কি ভাবে।
শুভর ছুটির আনন্দ মিতার জন্যই মাটি হয়ে যায়। মিতাকে নিয়ে আসলে ওর বাসায় থাকতেই মন
চায়না। এমন অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে মিতা। অবশ্য বাসা থেকে বের হয়েও আরাম নেই। রফিক
দেশে নেই।হাবিব আছে।ঈদের বিকালে হাবিবের ওখানেই গিয়েছিল সে, মিতাকে না বলে।
হাবিবের বউ ও ডাক্তার।কি সুন্দর আপ্যায়ন করল হেসে হেসে। হাসতে হাসতেই বল্ল, ভাবিকে
নিয়ে আসলেন না কেন?
শুভর কোন কালেই মিতাকে
নিয়ে বেড়াতে ভাল লাগেনা। মিতা আগে অনেক ডিমান্ডিং ছিল। এখন কেমন, ভালো করে জানেনা
শুভ।বল্ল, ওর শরীরটা তেমন ভালনা।
ফুড পয়জনিং নাকি?এবার যা
গরম পড়েছে!
হুম।ওরকমই
নাস্তা দিয়ে হাবিবের বউ
চলে গেল। হাবিব চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, এসেছে?
হুম
কি বলে?
কি আর? ঈদের রোস্টারে
ডিউটি আছে
আগের ওখানেই আছে?
হুম
হাবিব ডানে বায়ে মাথা
নেড়ে চুক চুক করে শব্দ করে বল্ল, তাহলে তো সমস্যা।
শুভ সেমাইয়ের বাটি টেনে
নিয়ে বল্ল বাদ দে।
আজ সকালে বড়াপা হঠাত
বল্ল, চল নোহাটি যাবো। কে কে যাবি এক্ষুনি রেডি হ। সুমন বাদল এক্ষুনি চারটা রিক্সা
ঠিক কর।
বড়াপা আজ বিকালে চলে
যাবে। আম্মা বল্ল, এখন আর নোহাটি গিয়ে কি করবি? রান্না হচ্ছে, এখন গেলে ফিরবি কখন?
খাবি কখন?
বড়াপা হো হো করে হেসে
বল্ল, আম্মা, তুমিও চলো। তুমিও চলো ।
মিতাকে ডেকে বল্ল,
তাড়াতাড়ি তৈরী হও। নাবিলাকে সাজিয়ে দাও। চল, চল, মজা হবে।
শুভ তাড়াতাড়ি ঘর থেকে
বের হয়ে গেল। এখনি আবার একটা কান্ড হবে। নিশ্চয়ই এখন মিতা যেতে চাইবেনা। সুমন আর
বাদল চারটা রিক্সা এত তাড়াতাড়ি কিভাবে পেয়ে গেছে কে জানে, ওরা হৈ হৈ করে বাড়ির
ভিতর ঢুকে গেলে শুভ সিগারেট ধরালো। মহিলাদের তৈরী হতে অনেক সময় লাগে। রিক্সাওলারা
উসখুস করছে।ঈদের মৌসুমে পেসেঞ্জারের জন্য এভাবে বসে থাকা যায়?
শুভ বাজারের দিকে হাঁটতে
শুরু করেছিল।ওর ফোন বেজে উঠল। মিতা। উফ!
হ্যাঁ। কি?
মিতা বলছে, তুমি কোনদিকে
গেলে? আরেকটা রিক্সা লাগবে।
সুমনদের বলো ডেকে দিতে?
মিতা কিছুক্ষণ চুপ করে
থেকে বল্ল, তুমি যাবেনা?
শুভ বল্ল, যাও তোমরা
আপাদের সাথে। আমাকে টানছ কেন?
মিতা চুপ করে আছে। কোন
কথা বলছেনা কেউ। শুভ হঠাত অধৈর্য গলায় বলে উঠল, তুমি কি আসলে যেতে চাচ্ছনা?
আমি একা দাঁড়িয়ে আছি।
আপারা রওনা হয়ে গেছে। কোন রিক্সা নাই এখানে। আমি কিছুই চিনিনা। কোনদিকে যাবো?
শুভর মাথা দপ দপ করতে
থাকল।নাবিলা?
আপার সাথে। আপার রিক্সায়।
শুভ চিৎকার করে বলে উঠল,
এখন আমি কি করব?! তুমি গেলেনা কেন ওদের সাথে? আমি অন্য কাজে আছি। তুমি যাবানা,
যেওনা, ভালো কথা। আমাকে এর মাঝে কিসের জন্য যে
একটা খালি রিক্সা
যাচ্ছে। শুভ লাফ দিয়ে রিক্সায় উঠে পড়ল। বাসার গেটের পাশে মিতা দাঁড়িয়ে আছে। গরমে
ঘেমে গেছে ওর ফরসা মুখ। চোখে ভারী চশমা। একটুও সাজেনি। মানে বুঝাতেই তো হবে, না,
যে সে অনিচ্ছায় যাচ্ছে? এমনকি ঈদে কোন নতুন কাপড়ও কিনেনি এই একরোখা মেয়েটা।
শুভ রিক্সা থেকে নেমে
বল্ল, যাও,ওঠো।
মিতা আহত গলায় বল্ল,
তুমি যাবানা?
আমার যাওয়ার সাথে কি?
আমি ত চিনিনা
চিনতে হবে না। রিক্সাওলা
চেনে। ফোন দিবা ওদের। বেশি দূরে তো না। যেতে চাইলে যাও। নাহলে দরকার নাই।
রিক্সাওলা মাথা নাড়ছে,
আমি চিনিনা, নতুন লোক
মিতা রিক্সায় উঠছেনা।
এখন এই রাস্তার উপরে নাটক করবে নাকি? কি যন্ত্রণা।
শুভ রিক্সাওলার দিকে
খেকিয়ে বলে উঠল, চিনোনা, আগে বলবা না? যতোসব।
রিক্সাওলা কিছু বলতে
যাচ্ছিল, হাত তুলে ত্তাকে থামিয়ে গজরাতে গজরাতে শুভ রিক্সায় উঠে বসল। মিতা এবার
পিছন পিছন বসল শুভর পাশে।
এই ভ্যাপসা গুমোট গরম
রোদের দিনে বেড়াতে কার ভাল লাগে?মিতারও লাগছেনা। শুভ মোবাইল বের করেছে।অন্যদিকে
ঘুরে বসেছে। রিক্সা চলা শুরু হয়েছে। মিতার বুকের ভীতরে শীতল একটা ঠান্ড দলা পাকিয়ে
আছে। এটা কি ভালোবাসা না কোন বেদনা, মিতা জানেনা। বহুবহু দিন পর ওরা দুইজন একসাথে
রিক্সায় করে কোথাও যাচ্ছে।
রিক্সাওলার গায়ের জামা
ভিজে সপসপে হয়ে গেছে। মিতা বল্ল, অনেক গরম, না?
শুভ তার আগের রাগের
গলাতেই বলতে থাকল, গরমকাল, গরম তো হবেই। সারাদেশেই গরম। এইটুকু গরম এখন সহ্য
হচ্ছেনা?
মিতা বল্ল, এমন করছ কেন
তুমি? আমি কি করেছি? কি বল্লাম আমি?
কি করেছ, নিজেই বল। আমি
কি বলব?!
মিতা বল্ল, তুমিই বল কি
করেছি? তোমার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে মানুষ মেরে ফেলেছি?!
শুভ বল্ল, আমি আগেই
বলেছি, ইচ্ছা না হলে তোমার আসার দরকার নেই এখানে। তারপরও তুমি আসলা।
এসেই একের পর এক ঝামেলা
করছ। আসলে আমার শান্তি সহ্যই করতে পারোনা তুমি।পুরা ঈদটাই মাটি। যত্তোসব।
রিক্সা টেনে টেনে নিয়ে
যাচ্ছে। রিক্সায় বোধহয় কোন সমস্যা আছে, ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ধীর একটা বিরক্তিকর শব্দ
হচ্ছে। মিতার দুই চোখ দিয়ে পানি পড়ে গাল ভিজে যাচ্ছে।
মহিলা হয়ে জন্মানোর এই এক সমস্যা। রাহ, বিরক্তি, হতাশা, ভালোবাসা, প্রেম, ক্রোধ বিরহ যে কোন কিছু ঘটলেই চোখ দিয়ে অকারণে পানি পরতে থাকে। চোখ জ্বলছে মিতার। শুভ ফোনে কথা বলছে।
মহিলা হয়ে জন্মানোর এই এক সমস্যা। রাহ, বিরক্তি, হতাশা, ভালোবাসা, প্রেম, ক্রোধ বিরহ যে কোন কিছু ঘটলেই চোখ দিয়ে অকারণে পানি পরতে থাকে। চোখ জ্বলছে মিতার। শুভ ফোনে কথা বলছে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক আছে।
বিকাল পাঁচটা। ঠিক আছে, ঠিক আছে। হাহাহা।আচ্ছা সমস্যা নাই।
শুভর হাসিভরা উতফুল্ল
গলা শুনে মিতার মনে হচ্ছে শুভ খুব আনন্দে আছে। এইমাত্র যে সে বল্ল তার পুরা ঈদ মাটি, কথাটা সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা।
[photo source: internet]
[photo source: internet]

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন