সোমবার, ২১ মার্চ, ২০১৬

আড্ডা হবে

ফজলে রাব্বি তার হাতের গ্লাসের তরলে মৃদু ঢেউ তুলে হাতটা উপরের দিকে উঠিয়ে গভীর জ্ঞানী গলায় বলে উঠল-
-টু  বই অর নট টু বই, দ্যাট ইস দ্যা কোশ্চেন।
সে কোষচেন কথাটা এমনভাবে উচ্চারণ করেছে যেন কথাটা 'কোশ্চেন' না, 'কুয়েইশ্চেন'

তার কথা সগুনে ঘরের সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
বীথি সাথে সাথে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা ফজল, কথাটার মানে কি রে?

ফজলে রাব্বি আঁতকে ওঠার ভান করে বীথির দিকে তাকালো।বীথির প্রশ্নে আর ফজলের অঙ্গভঙ্গিতে ঘরের সবাই আবার হো হো করে হেসে উঠল।হাসি একটু কমতেই বীথি আবার জিজ্ঞেস করল, আরে হাসিস না, বল না মানে কি?
ফজল তার হাতে ধরা সিল লাগানো ওয়াইন গ্লাসে কোক আর স্প্রাইটের 'কক্টেল' এক চুমুকে শেষ করে খট করে গ্লাসটা টেবিলে রেখে বল্ল,
জানিনা।

এবার নিপুণ, জামিল আর সুমি সবচেয়ে বেশী জোরে শব্দ করে হাসি শুরু করল। কিছুখণ পর বীথি আর ফজলও হাসিতে যোগ দিল। নিপুণ হাসতে হাসতেই ফজলকে বল্ল, জোকার একটা!!
বন্ধুরা একসাথে হলে এমনই হয় আসলে। হাসির কোন কারণ লাগেনা।

আজ ৩০শে জুন, মঙ্গল্বার।সুমি আর জামিলের ফার্স্ট ম্যারেজ ডে। সবাই ভুলেই গেছিল। নিপুণ ফোন করেছিল ফজলকে, সকাল দশটায়। ফজল তখন অফিসে। কোনদিকে তাকানোর সময় নেই।তার ব্যাংক এর ইয়ার ক্লোজিং এর কাজ চলছে। নিপুণের ফোন ধরতেও দেরী হয়েছে। নিপুণ কড়া গলায় বলেছে, সত্যি যাবিনা সুমির ওখানে? ফজল ও তত জোর গলাতেই বলছে 'না। তুই পাগল? কেমনে কি?
সত্যি যাবিনা?
গাধা তুই ফোন রাখ। টাইম নাই


কিন্তু আধাঘন্টা পরে কয়েকটা কজে ভুল করে, অনেক উশখুশ করে হাত কচলে হাত কচলাতে কচলাতে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদীর মত স্যারের সামনে গিয়ে বলেছে, স্যার, আমার আজ একটু -- ইয়ে মানে ছুটি লাগবে-- আম্মা বাথরুমে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে।। স্যার আমি যাব আর আসব


তারপর মতিঝিল থেকে মিরপুর আসতে সময় লেগেছে আড়াই ঘন্টা।বাসে ঝুলতে ঝুলতে। সারাটা রাস্তা ভাবতে ভাবতে এসেছে, এক বছর পার হয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি? এ-ক বছর?

সুমি দরজা খুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ ফজলের দিকে।
কি হইছে? কোত্থেকে আসলি?

ফজল উচ্ছবসিত গলায় বল্ল, আর সব কই?
একরকম সুমিকে ধাক্কা দিয়েই ঘরে ধুকে গেল সে।
সুমি অবাক গলায় বল্ল, আর সব মানে? আর কে আসবে?
নিপুণ কই? নিপুণ? ফ্যান ছাড় তো সুমি? এত্ত গরম ক্যান এই বাসা? থাকস কেমনে?
বলতে বলতে পকেট থেকে ফোন বের করে ছোট টেবিলটাতেই বসে পড়ল ফজল, বিড় বিড় করছে, নিপুণের বাচ্চা!!

সুমি ফ্যানের সুইচ দিয়ে ঠান্ডা পানি আনতে গেল। ঠান্ডা তো না, ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানি। ফজল দরদর করে ঘামছে। সুমি এতখণে বুঝেছে, সবাই ওর এখানে আসার প্ল্যান করেছে। ফজল আগেই চলে আসছে একা। বরাবরই একটু কম বুঝে ফজল। ওর রাগী মুখ দেখে সুমির হাসিই পেয়ে গেল। হাসি চেপে গ্লাস হাতে দাড়ালো ফজলের পাশে।

ফজল ফোন কানে নিয়েই এক নিশ্বাসে পানি খেল। বল্ল, হারামীটা ফোন ধরে না কেন!!
সুমি বল্ল, তুই কছু খাবি? ভাত খাবি?

ফজল উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ল, দাঁড়া আগে এইটা মিমাংসা করি। বদটার জন্য আজকে আমার চাকরি যাবে। এখন ফোন ধরেনা। কেমন হারামী দ্যাখ খালি

সুমি ক্কিছু না বলে রান্না চাপাতে গেল। পাগল গুলি সব আসবে আজ।  ঠিক মনে আছে ওদের ম্যারেজ ডে-র কথা। সুমির মুখে হাসি কিন্তু চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বুক ঢিপ ঢিপ করছে। কিছুই নেই ঘরে কি দিয়ে আপ্যায়ন করবে ওর জানের বন্ধুদের? জামিলটা না! দিন দিন জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পেয়ে যাচ্ছে যেন, একটু আয়োজন করবেনা? এসব ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল সুমির। এখন অবশ্য একটুতেই মন কেমন যেন করে উঠতে থাকে সুমির। পাঁচ মাস চলছে ওর। এমন সময়ে একা থাকা যে কেমন লাগে, সুমি ছাড়া কেউ বুঝবে না।

দুই রুমের বাসা।ছোট ব্যালকনি। বসার ঘরে ফজল চিল্লাচ্ছে। সুমি মিট্মিট করে হাসতে হাসতে শুনছে ফজল আর নিপুণের ঝগড়া। সেই ক্লাস এইট থেকে যে দুইজনের ঝগড়া শুরু হল, আর শেষই হলনা।

কিছুখণ চুপ। তাড়াতাড়ি করে কাটাকাটি করতে গিয়ে হাত কেটে ফেলেছে সুমি।
রান্না উঠিয়ে দিয়ে বসার ঘরে এসে দেখে মাটিতে পাতা তোষকে অফিসের ব্যাগ মাথায় দিয়ে ফজল বেঘোরে ঘুমাচ্ছে



বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ, ২০১৬

দরকারী ক্লাস







চার তলায় সার্জারি ওয়ার্ডে ক্লাস। মোস্তফা মাহবুব স্যার ক্লাস নিবেন।উনি ছাত্র ছাত্রীদের দেরী করে ক্লাসে যাওয়া একদমই পছন্দ করেননা। অন্য স্যারদের মত ‘যাও, রুগীর হিস্ট্রি নাও’ বলে ওয়ার্ডের ভিতর ছাত্রদের আজাইরা ঘুরতে বলেননা।ঠিক পোণে দশটায় স্যার ওয়ার্ডের সারি সারি বেডের মাঝখান বরাবর  হাঁটাহাঁটি শুরু করেন।ধীরে ধীরে স্যারকে ঘিরে দাঁড়াতে থাকে ছাত্র ছাত্রীরা।স্যার তার গম্ভীর কিন্তু শ্রুতিমধুর স্বরে  পড়ানো শুরু করেন প্রত্যেকের চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন এবং প্রশ্ন করতে বলেন। কিন্তু বিশ মিনিট পরে ক্লাসে এসে কেউ তার লেকচারের লেজ ধরবে, তা হবেনা। উনি সেই ছাত্রকে জটলার মাঝখানে ডেকে নিয়ে আসবেন।বুলেটের মত একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকবেন। ছাত্র যখন নাস্তানাবুদ হয়ে ঘামতে থাকবে, তখন নিতান্ত অবহেলায় হাত ইশারায় তাকে চলে যেতে বলে থমথমে গলায় স্যার বলতে থাকবেন, he is not smart enough to attend my class in time!although his arrogance showed he knows everything!!
তবে উনি পড়ান মারাত্মক।ক্লাসে কোন বই খাতাও লাগেনা। সম্পূর্ণ লেকচার উনি মাথায় বসিয়ে দিতে পারেন। তাই উনার এই অপমান করাটুকু কেউ খারাপভাবে নেয়না।সেই জন্যই বলা যায়,ছাত্রদের কাছে তার আলাদা কোন নাম নেই। সবাই তাকে মোস্তফা মাহাবুব নামেই ডাকে।

এখনো আঠারো মিনিট বাকি আছে লেকচার শুরু হতে। মিতা বার বার ঘড়ি দেখছে। সকালের লেকচার শেষ করে মেয়েরা হোস্টেলে ফিরে আসে, হোস্টেলের ক্যান্টিনে নাস্তা করে, সেখান থেকেই একসাথে আবার ওয়ার্ডের ক্লাস করতে চলে যায়। কিন্তু আজ একটা মেয়েলি কারণে মিতাকে ডাইনিং থেকে দুইতলায় তার রুমে আসতে হয়েছে। শরীর খুব খারাপ লাগছে আজ, পা কামড়াচ্ছে আর দুইটা ওষুধ খেয়েও পেট ব্যথা বিন্দুমাত্র কমেনি, কিন্তু ওয়ার্ডে মোস্তফা মাহবুব স্যারের ক্লাস মিস দেয়া যাবেনা। মিতা তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নিল।
হাসপাতালের নিচতলায় দুই নম্বর লিফটের সামনে মহা গ্যাঞ্জাম লেগে আছে।শত শত লোকজন লিফটের সামনে।লিফটের উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে,’ এই লিফট শুধুমাত্র ডাক্তার এবং ছাত্র ছাত্রীর ব্যাবহারের জন্য’ কিতু রুগীর লোকজনকে আটকানো যাচ্ছেনা।মিতা ভিড় ঠেলে লিফটের কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করছে।ওর পরণে সাদা এপ্রন।লিফটম্যান মামা একবার ওকে দেখতে পেলেই ভীড় সরিয়ে ঠিকই ওকে লিফটে উঠিয়ে ফেলবে।
মিতার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা হঠাত উঁচু গলায় চিৎকার শুরু করল, এই সরেন, সরেন, সরেন!
ওর উচ্চকিত স্বরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও লোকজন সরে জায়গা দিতে থাকল।এখন লিফট্ম্যান মামা মিতা কে দেখেছে।সে মিতাকে লিফটে উঠিয়ে ফেল্ল।মিতার পাশে দাঁড়ানো চৌখুপি শার্ট পরা ছেলেটাও উঠেছে। লিফটের দরজা বন্ধ হতে হতে কোথা থেকে শিমু আপু ঢুকল। উনাদের প্রফের ভাইবা আগামী শনিবার থেকে। আপুরা  বোধহয় নাওয়া খাওয়া ঘুম ছেড়ে দিয়েছে।উনার কাঁধের ব্যাগ বই খাতার ভিড়ে ছিড়ে যাচ্ছে প্রায়। তিন তলায় শিমু আপু নেমে গেল।
চারকোণ খোপ খোপ হাফ হাতা শার্ট পরা ছেলেটা হঠাত বলে উঠল, কি রে মিতা, সারাখণ ভুরু কুঁচকে থাকিস কেন, বলত? তোর কি সারাক্ষণ মাথা ধরে থাকে নাকি?
মিতা হকচকিয়ে গেল। কে ছেলেটা? নাম ধরে ডাকছে কিন্তু ছেলেটাকে সে চিনতে পারছেনা।হকচকানোর আরো একটা কারণ হল, মিতাকে কেউ কখনো তুই করে ডাকেনা।ওর রুমমেটরাও না। ফার্স্ট-প্রফে পুরো ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড হওয়া মেয়েকে খুব কাছের মানুষ ছাড়া কেউ তুই করে ডাকতে পারেনা।
শ্যামলা করে ছেলেটা। কোঁকড়ানো চুল।মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মিতা চিনতে পারছেনা। সবচেয়ে বড় কথা হল, ছেলেটার পোষাক-আষাক খুবই অগোছালো এবং ময়লা। মনে হচ্ছে গত দুই তিন ধরে সে গোসল করেনি। শুধু গোসল করেনি তা না, সে তার জামা কাপড়ও বদলায়নি।
ছেলেটা তার উত্তরের আশায় চুপ করে বসে নেই।সে লিফট-ম্যান মামার সাথে গল্প করছে- তার আজ কতখন ডিউটি? নাইট শিফট হলে কি পরদিন ছুটি পাওয়া যায়? লিফট ম্যান হওয়ার যোগ্যতা কি?লিফট মেরেমত করাও কি জানতে হয় নাকি?  
ছয়তলা এসেছে। নিচের মত এত লোকজনের ভিড় নেই এদিকে। এটা আসলে সার্জারি পুরুষ ওয়ার্ডের পিছন দিক। সোজা গেলে রুগীদের কাঁটা-ছেড়া ড্রেসিং-ব্যান্ডেজ করার ‘প্রসিডিওর রুম’, তারপর স্যার দের চেম্বার। স্যারেরা বোধহয় তাদের চেম্বারের অংশের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে খুব কড়া।তাই এই দিকটা খুব পরিস্কার। দেখলেই মনে হয়, কিছুক্ষণ আগে বোধহয় সোয়াব দিয়ে মুছে নিয়ে গেছে। কয়েকটা পাতাবাহার গাছও আছে।
মিতা নেমে গেল।আর পাঁচ মিনিট আছে ক্লাসের। দ্রুত পায়ে হাঁটছে সে। টেনশনে পেটের ব্যথা গায়েব হয়ে গেছে।বা ওষুধ গুলি কাজ করছে এতখণে। কোঁকড়া চুলের ছেলেটাও নেমেছে।মিতার পাশে পাশেই হাঁটছে। ছেলেটার সাথে কোন বই খাতা নেই। দুই জনই ক্লাসে ঢুকল।না এখনো ছেলেটার নাম মনে পড়েনি ছেলেটার। অবশ্য সে মনে করতে চেষ্টাও করছেনা। নিশ্চয়ই খুব ফাঁকিবাজ, নয়ত ব্যাচের সবাইকে তো চেনেই মিতা।এ কে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ছেনা।
মোস্তফা মাহবুব স্যারকে ঘিরে ছাত্র-ছাত্রীরা জড়ো হতে শুরু করেছে। মিতা তাড়াতাড়ি ওদের সাথে মিশে গেল।শুধু মিশে গেল তাই না,মিতুল, টুম্পা সরে গিয়ে মিতাকে সবচেয়ে সামনে দাঁড়ানোর জায়গা করে দিল।
মোস্তফা মাহবুব স্যার এখন পারসেন্টেজ নিবেন।মিতা দেখল কোকড়া চুলের ছেলেটা রেজিস্ট্রার স্যারের রুম থেকে বের হচ্ছে।দুইজনে খুন চেনা মানুষের মত কথা বলতে বলতে হাঁটছে।রেজিস্ট্রার স্যার ছেলেটার কাঁধ চাপড়ে দিচ্ছেন আর ছেলেটা দন্ত বিকশিত করে হাসছে।ওর শুকনা ধুলাপড়া চোখ মুখ হাসিতে চিকচিক করছে।
হঠাত মিতার মনে পড়ে গেল, আরে এ তো সি বাচের শিহাব! কিন্তু শিহাবের এই অবস্থা কেন?
মোস্তফা মাহবুব স্যার পড়ানো শুরু করেছেন, আজকের টপিকটা খুবই দরকারী। কিন্তু শিহাব এই দরকারী ক্লাসের দিকে একবারো ফিরেও তাকালো না। রেজিস্ট্রার স্যারের সাথে হাসতে হাসতে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে গেল। 

[photo source: internet]

মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০১৬

কমনরুমের বাসিন্দা



কমনরুমে ঠিক ৩২টা বিছানা পাতা আছে।এই-মাথা থেকে ওই-মাথা পর্যন্ত। নিজের জন্য বরাদ্দ শক্ত চকি-তে শুয়ে শুয়ে গুনেছে মিতা এতখন ধরে। চার সারিতে আট টা করে বিছানা পাতা। আট টাই তো? এই দিকে কি একটা কম? মিতা আবার গুনতে শুরু করল—এক, দুই, তিন...।
ওর মাথার পাশে এনাটমি বই খুলে রাখা।কি সব জটিল জটিল শব্দ মনে রাখতে পারছেনা সে। সন্ধ্যা থেকে বহুকষ্ট এক পাতা পড়েছে।এখন মাথা খালি খালি লাগছে। মাথার পাশে বই রাখে সে তাই চকি গুনছে।
তার পাশের চকি-তে থাকে সুমনা।সে পড়া টড়া শেষ করে খুব যত্ন করে চুলে তেল লাগাচ্ছে। মিতা কিছুক্ষণ ওর চুলে তেল লাগানো দেখল।কি কুচকুচে কালো চুল সুমনার।সে খুব ধীরে ধীরে তেল লাগালো, ধীরে ধীরে পরিপাটি করে চুল আঁচড়ালো, মনে হচ্ছে ওর বুঝি খুব আরাম লাগছে।সুমনার আরাম দেখতে দেখতে মিতার ও খুব আরাম লাগতে থাকল।
মিতা আর সুমনার চকির পর ছোট্ট একটু হাঁটার জায়গা। তারপর আবার দুইটা চকি গায়ে গায়ে লাগানো। ‘এ’-ব্যাচের টুম্পা আর মিতুল দুলে দুলে গুনগুন করে পড়ছে সেখানে। কাল ওদের আইটেম আছে।
মিতা আবার চোখের সামনে বই মেলে ধরল। কোন অঙ্গের সামনে পিছনে কোন অঙ্গ, শিরা ধমনী, ঠিক ঠিক মনে রাখা চাই।কিন্তু মনে থাকতে চাচ্ছেনা। মাথায় ঢুকছেনা ঠিকমত। কার পিছনে কে, মিতা খালি গন্ডগোল পাকাচ্ছে।
বই সরিয়ে রেখে মিতা ছাদের দিকে তাকালো।একটানা ঘুরতে থাকা সারি সারি ফ্যানের ক্লান্তিকর ঘট ঘট শব্দটা মিতা তখন শুনতে পেল। দেয়ালে আর ছাদে অনেক কালি ঝুলি। কবে শেষবার ঝাড়া হয়ছিল দেয়াল আর ছাদ? কে জানে। ক্লান্ত বিষণ্ন ছাদে দেখার কিছু নেই। পাশ ফিরে আবার চকি গুনছে মিতা অজান্তেই। ৩২টাই চকি। ঠিকই আছে। তবে ৩২জন থাকেনা এখানে। ছয় সাত জন ‘লোকাল’ আছে।ওরা বাসা থেকেই ক্লাস করে। তবু কমনরুমে চকি পেতে রেখে গেছে।যদি কখনো দরকার পড়ে, বা হয়ত পরীক্ষার আগে ওরা এসে হোস্টেলে থাকবে।
রাত আটটা চল্লিশ বাজে।ক্যান্টিনের ঘন্টা দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। কেউ কেউ নিচে নেমে গিয়েছে খেতে। কারো কারো খাবার বাটিতে ভরে উপরে দিয়ে যাবে আয়ারা।মিতা নতুন আয়া ঠিক করেছে গতকাল।সে খাবার রেখে যাবে টেবিলে। এখনো ক্ষুধা লাগেনি। মিতা আবার বই হাতে নিল।পাতায় পাতায় আঁকা লাল নীল চিত্র দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গেল অসময়েই।
ঘুম ভাঙ্গল গভীর রাতে। একটা বাইশ বাজে। সুমনা বোধহয় ওর মশারী খাটিয়ে দিয়েছে।কিন্তু মশা ঢুকেছে মশারীর ভিতরে,হাত পা মুখে জায়গায় জায়গায় চুলকাচ্ছে আর জ্বলছে। মিতা বিছানায় উঠে বসল।
কমনরুমের সেই গমগমে রূপ নেই। এখন সারি সারি মশারী টানানো চারদিকে।সবাই শুয়ে পড়েছে। হালকা একটা আলো এই বিশাল ঘরটায়। অন্ধকারে মশা খুঁজে পাচ্ছেনা মিতা। দুই চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেছে আর মিতা লক্ষ্য করল ওর অসম্ভব ক্ষুধা পেয়েছে। আবছা আলোয় দেখতে পাচ্ছে ওর বালিশের কাছে এনাটমি বইটা এখনো পড়ে আছে।তবে খোলা না, সুমনা বোধহয় বইটা বন্ধ করে রেখেছে।
শব্দ না করে আস্তে আস্তে উঠে পড়ল মিতা।টেবিলে ওর খাবার রাখা আছে। টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে মিতা বাটি গুলো খুলে দেখতে থাকল আজ কি দিয়েছে ওর ‘খালা’। ভাত, তরকারি আর ভাজি-মতন কি একটা সবজি রাখা ভাতের একপাশে।ঠান্ডা তো হয়েই গেছে বহু আগে।কেমন বাসি বাসি একটা গন্ধ ছড়াচ্ছে তরকারিটা থেকে। মিতার ক্ষুধা মরে গেল।
ঘুমটাও এমন সময় নিমেষে যে উধাও হয়ে গেল দুই চোখ থেকে, মিতার খুব খারাপ লাগতে থাকল একা একা। এত চুপ চারদিক, মনে হচ্ছে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেও জোরে করে শব্দ হয়ে যাবে। মিতার খুব ইচ্ছা করছে ট্রাংক খুলে ছবির এলবামটা বের করে। এলবাম ভরা মায়ের ছবি। যে নেই, তাকে ধরে রাখার কি প্রাণান্ত চেষ্টা মানুষের! মনে মনে ঠিক করল মিতা ছবিগুলো টেবলের ড্রয়ারে রেখে দিবে। এখন এই রাত দুপুরে এত বড় ভারী ট্রাংক শব্দ ছাড়া মিতা চকির নিচ থেকে বের করতে পারবেনা একে একা।
বারান্দায় চলে আসল মিতা। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। চারদিক নিঃঝুম চুপ। শুধু দূরে টিভি রুমের ভেজানো দরজা গলে মাটিতে তেছড়া হয়ে একটা আলোর ছায়া পড়ে আছে। মনে হয় ভিতরে কেউ আছে, টিভি দেখছে।
টিভি রুমটা অদ্ভুত। প্রথম দিন দেখেই মিতার বুকে একটা ধাক্কার মত লেগেছিল। কমন রুমের মত বড় না হলেও অনেক বড় একটা ঘর। মাত্র দশ বারোটা চেয়ার, দুইটা কাঠের বেঞ্চ আর একটা নড়বড়ে টেবিল পাতা। ধুলায় ভরা ঘর। একপাশে দেয়াল ঘেঁষে বড় একটা কাঠের বাক্সে ভরা ছোট্ট একটা পুরান আমলের টিভি। ব্যাস।
টিভিটা কোন মতনে চলে। রিমোটের সাউন্ড বাড়ানোর বোতামটা ভাঙ্গা ।প্রায়ই ডিশের
কানেকশন থাকেনা। সেদিনও রাতে, টিভি রুমে আলো দেখে মিতা উঁকি দিয়ে দেখে, খালি ঘরে কেউ নেই, এমনি এমনি টিভি চলছে, আর টিভির পর্দা জুড়ে ঝিরঝির করে খেলা করছে অসংখ্য সাদাকালো বুদবুদ।
আজো বুঝি এমনিই চলছে টিভি?
না, এক সিনিয়র আপু বসে আছে। চেয়ারে পা তুলে, হাঁটুতে মাথা গুজে বসে আছে আপুটা। মিতা দরজায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে থাকল। নীরব কমনরুমে এখনই ফিরে যেতে ইচ্ছা করছেনা। কিন্তু আপুদের সাথে টিভি দেখার অনেক নিয়ম কানুন আছে।বড় আপুদের মুখের উপর কথা বলা যাবেনা। রমোট থাকবে আপুদের হাতে।সালাম তো দিতেই হবে। কিন্তু এখন এই রাত দুপুরেও কি একই নিয়ম খাটবে?
আপু মিতা কে দেখতে পেয়েছে। মিতা ঢুকছেনা দেখে হাত উচিয়ে ডেকে বল্ল,
আসো। ভিতরে আসো।
মিতা অজান্তেই মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম দিয়ে ফেল্ল। সাথে সাথেই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল নিজের কাছেই। পুতুলের মত একভাবে হেঁটে গিয়ে আপুর পাশের এক চেয়ার খালি রেখে মিতা বসল।এখনো ইতস্তত লাগছে। মনে করতে পারছেনা, একই সাথে কি বসা যাবে বড় আপুদের পাশে? কি যেন বলেছিলেন নেত্রী আপু?
অ্যাড হচ্ছে টিভিতে। আপু ভলিউম কমিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ৩১ তম? ফার্স্ট ইয়ার?
জ্বি আপু
চারতলা কমন রুম?
জ্বি
কি নাম?
শারমিন।
মিতার ভালো নাম শারমিন সুলতানা। বাবা বলেছিলেন ক্যাম্পাসে সবাইকে ভাল নাম বলতে। বেশির ভাগ মানুষই এখানে জানেনা যে ওর ডাক নাম মিতা।
শারমিন, কি দেখতে চাও, দ্যাখো।
না আপু, কিছু দেখব না।
আপু রিমোট এগিয়ে দিতে দিতে বললেন,
দ্যাখো দ্যাখো। অবশ্য তেমন কিছু দেখার নেই। কিচ্ছু খুঁজে পেলামনা কোথাও। অ্যাড দেখতে দেখতেই ঘুম পেয়ে যাচ্ছে।
মিতা চুপ করে থাকল।
আপু চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, দেখেছ? কিচ্ছু নাই টিভিতে, ধুর।
তারপর দুজনেই কিছুখন চুপ।
তোমার কোন পরীক্ষা আছে নাকি কাল?
না আপু। এমনিতেই ঘুম আসছেনা।
আপু হাই তুলতে তুলতে বললেন, আমি গেলাম। তুমি দ্যাখো যা মনে চায়।
রিমোট দিয়ে আপু চলে গেলেন। মিতা কিছুক্ষণ খালি ঘরে শব্দশীল টিভির সামনে বসে থাকল। আসলেই দেখার তেমন কিছু নাই।
কিছুক্ষণ পর হঠাত মিতার কেমন গা ছমছম করতে থাকল। ভয় না ঠিক, কেমন যেন। টিভি অফ না করেই তাড়াতাড়ি কমন রুমে চলে আসল মিতা। কেন যেন বুক ধড়ফড় করছে।
তাড়াতাড়ি চকিতে উঠতে গিয়ে ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হয়ে গেল। পাশের চকি থেকে সুমনা ঘুম জড়ানো গলায় বলে উঠল,
'শারমিন, দরজা বন্ধ করে দিয়ে তারপর ঘুমাতে আয়। আর টেবিল ল্যাম্প বন্ধ কর। চোখে আলো লাগছে।'

[photo source: internet]