মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০১৬

কমনরুমের বাসিন্দা



কমনরুমে ঠিক ৩২টা বিছানা পাতা আছে।এই-মাথা থেকে ওই-মাথা পর্যন্ত। নিজের জন্য বরাদ্দ শক্ত চকি-তে শুয়ে শুয়ে গুনেছে মিতা এতখন ধরে। চার সারিতে আট টা করে বিছানা পাতা। আট টাই তো? এই দিকে কি একটা কম? মিতা আবার গুনতে শুরু করল—এক, দুই, তিন...।
ওর মাথার পাশে এনাটমি বই খুলে রাখা।কি সব জটিল জটিল শব্দ মনে রাখতে পারছেনা সে। সন্ধ্যা থেকে বহুকষ্ট এক পাতা পড়েছে।এখন মাথা খালি খালি লাগছে। মাথার পাশে বই রাখে সে তাই চকি গুনছে।
তার পাশের চকি-তে থাকে সুমনা।সে পড়া টড়া শেষ করে খুব যত্ন করে চুলে তেল লাগাচ্ছে। মিতা কিছুক্ষণ ওর চুলে তেল লাগানো দেখল।কি কুচকুচে কালো চুল সুমনার।সে খুব ধীরে ধীরে তেল লাগালো, ধীরে ধীরে পরিপাটি করে চুল আঁচড়ালো, মনে হচ্ছে ওর বুঝি খুব আরাম লাগছে।সুমনার আরাম দেখতে দেখতে মিতার ও খুব আরাম লাগতে থাকল।
মিতা আর সুমনার চকির পর ছোট্ট একটু হাঁটার জায়গা। তারপর আবার দুইটা চকি গায়ে গায়ে লাগানো। ‘এ’-ব্যাচের টুম্পা আর মিতুল দুলে দুলে গুনগুন করে পড়ছে সেখানে। কাল ওদের আইটেম আছে।
মিতা আবার চোখের সামনে বই মেলে ধরল। কোন অঙ্গের সামনে পিছনে কোন অঙ্গ, শিরা ধমনী, ঠিক ঠিক মনে রাখা চাই।কিন্তু মনে থাকতে চাচ্ছেনা। মাথায় ঢুকছেনা ঠিকমত। কার পিছনে কে, মিতা খালি গন্ডগোল পাকাচ্ছে।
বই সরিয়ে রেখে মিতা ছাদের দিকে তাকালো।একটানা ঘুরতে থাকা সারি সারি ফ্যানের ক্লান্তিকর ঘট ঘট শব্দটা মিতা তখন শুনতে পেল। দেয়ালে আর ছাদে অনেক কালি ঝুলি। কবে শেষবার ঝাড়া হয়ছিল দেয়াল আর ছাদ? কে জানে। ক্লান্ত বিষণ্ন ছাদে দেখার কিছু নেই। পাশ ফিরে আবার চকি গুনছে মিতা অজান্তেই। ৩২টাই চকি। ঠিকই আছে। তবে ৩২জন থাকেনা এখানে। ছয় সাত জন ‘লোকাল’ আছে।ওরা বাসা থেকেই ক্লাস করে। তবু কমনরুমে চকি পেতে রেখে গেছে।যদি কখনো দরকার পড়ে, বা হয়ত পরীক্ষার আগে ওরা এসে হোস্টেলে থাকবে।
রাত আটটা চল্লিশ বাজে।ক্যান্টিনের ঘন্টা দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। কেউ কেউ নিচে নেমে গিয়েছে খেতে। কারো কারো খাবার বাটিতে ভরে উপরে দিয়ে যাবে আয়ারা।মিতা নতুন আয়া ঠিক করেছে গতকাল।সে খাবার রেখে যাবে টেবিলে। এখনো ক্ষুধা লাগেনি। মিতা আবার বই হাতে নিল।পাতায় পাতায় আঁকা লাল নীল চিত্র দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গেল অসময়েই।
ঘুম ভাঙ্গল গভীর রাতে। একটা বাইশ বাজে। সুমনা বোধহয় ওর মশারী খাটিয়ে দিয়েছে।কিন্তু মশা ঢুকেছে মশারীর ভিতরে,হাত পা মুখে জায়গায় জায়গায় চুলকাচ্ছে আর জ্বলছে। মিতা বিছানায় উঠে বসল।
কমনরুমের সেই গমগমে রূপ নেই। এখন সারি সারি মশারী টানানো চারদিকে।সবাই শুয়ে পড়েছে। হালকা একটা আলো এই বিশাল ঘরটায়। অন্ধকারে মশা খুঁজে পাচ্ছেনা মিতা। দুই চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেছে আর মিতা লক্ষ্য করল ওর অসম্ভব ক্ষুধা পেয়েছে। আবছা আলোয় দেখতে পাচ্ছে ওর বালিশের কাছে এনাটমি বইটা এখনো পড়ে আছে।তবে খোলা না, সুমনা বোধহয় বইটা বন্ধ করে রেখেছে।
শব্দ না করে আস্তে আস্তে উঠে পড়ল মিতা।টেবিলে ওর খাবার রাখা আছে। টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে মিতা বাটি গুলো খুলে দেখতে থাকল আজ কি দিয়েছে ওর ‘খালা’। ভাত, তরকারি আর ভাজি-মতন কি একটা সবজি রাখা ভাতের একপাশে।ঠান্ডা তো হয়েই গেছে বহু আগে।কেমন বাসি বাসি একটা গন্ধ ছড়াচ্ছে তরকারিটা থেকে। মিতার ক্ষুধা মরে গেল।
ঘুমটাও এমন সময় নিমেষে যে উধাও হয়ে গেল দুই চোখ থেকে, মিতার খুব খারাপ লাগতে থাকল একা একা। এত চুপ চারদিক, মনে হচ্ছে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেও জোরে করে শব্দ হয়ে যাবে। মিতার খুব ইচ্ছা করছে ট্রাংক খুলে ছবির এলবামটা বের করে। এলবাম ভরা মায়ের ছবি। যে নেই, তাকে ধরে রাখার কি প্রাণান্ত চেষ্টা মানুষের! মনে মনে ঠিক করল মিতা ছবিগুলো টেবলের ড্রয়ারে রেখে দিবে। এখন এই রাত দুপুরে এত বড় ভারী ট্রাংক শব্দ ছাড়া মিতা চকির নিচ থেকে বের করতে পারবেনা একে একা।
বারান্দায় চলে আসল মিতা। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। চারদিক নিঃঝুম চুপ। শুধু দূরে টিভি রুমের ভেজানো দরজা গলে মাটিতে তেছড়া হয়ে একটা আলোর ছায়া পড়ে আছে। মনে হয় ভিতরে কেউ আছে, টিভি দেখছে।
টিভি রুমটা অদ্ভুত। প্রথম দিন দেখেই মিতার বুকে একটা ধাক্কার মত লেগেছিল। কমন রুমের মত বড় না হলেও অনেক বড় একটা ঘর। মাত্র দশ বারোটা চেয়ার, দুইটা কাঠের বেঞ্চ আর একটা নড়বড়ে টেবিল পাতা। ধুলায় ভরা ঘর। একপাশে দেয়াল ঘেঁষে বড় একটা কাঠের বাক্সে ভরা ছোট্ট একটা পুরান আমলের টিভি। ব্যাস।
টিভিটা কোন মতনে চলে। রিমোটের সাউন্ড বাড়ানোর বোতামটা ভাঙ্গা ।প্রায়ই ডিশের
কানেকশন থাকেনা। সেদিনও রাতে, টিভি রুমে আলো দেখে মিতা উঁকি দিয়ে দেখে, খালি ঘরে কেউ নেই, এমনি এমনি টিভি চলছে, আর টিভির পর্দা জুড়ে ঝিরঝির করে খেলা করছে অসংখ্য সাদাকালো বুদবুদ।
আজো বুঝি এমনিই চলছে টিভি?
না, এক সিনিয়র আপু বসে আছে। চেয়ারে পা তুলে, হাঁটুতে মাথা গুজে বসে আছে আপুটা। মিতা দরজায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে থাকল। নীরব কমনরুমে এখনই ফিরে যেতে ইচ্ছা করছেনা। কিন্তু আপুদের সাথে টিভি দেখার অনেক নিয়ম কানুন আছে।বড় আপুদের মুখের উপর কথা বলা যাবেনা। রমোট থাকবে আপুদের হাতে।সালাম তো দিতেই হবে। কিন্তু এখন এই রাত দুপুরেও কি একই নিয়ম খাটবে?
আপু মিতা কে দেখতে পেয়েছে। মিতা ঢুকছেনা দেখে হাত উচিয়ে ডেকে বল্ল,
আসো। ভিতরে আসো।
মিতা অজান্তেই মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম দিয়ে ফেল্ল। সাথে সাথেই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল নিজের কাছেই। পুতুলের মত একভাবে হেঁটে গিয়ে আপুর পাশের এক চেয়ার খালি রেখে মিতা বসল।এখনো ইতস্তত লাগছে। মনে করতে পারছেনা, একই সাথে কি বসা যাবে বড় আপুদের পাশে? কি যেন বলেছিলেন নেত্রী আপু?
অ্যাড হচ্ছে টিভিতে। আপু ভলিউম কমিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ৩১ তম? ফার্স্ট ইয়ার?
জ্বি আপু
চারতলা কমন রুম?
জ্বি
কি নাম?
শারমিন।
মিতার ভালো নাম শারমিন সুলতানা। বাবা বলেছিলেন ক্যাম্পাসে সবাইকে ভাল নাম বলতে। বেশির ভাগ মানুষই এখানে জানেনা যে ওর ডাক নাম মিতা।
শারমিন, কি দেখতে চাও, দ্যাখো।
না আপু, কিছু দেখব না।
আপু রিমোট এগিয়ে দিতে দিতে বললেন,
দ্যাখো দ্যাখো। অবশ্য তেমন কিছু দেখার নেই। কিচ্ছু খুঁজে পেলামনা কোথাও। অ্যাড দেখতে দেখতেই ঘুম পেয়ে যাচ্ছে।
মিতা চুপ করে থাকল।
আপু চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, দেখেছ? কিচ্ছু নাই টিভিতে, ধুর।
তারপর দুজনেই কিছুখন চুপ।
তোমার কোন পরীক্ষা আছে নাকি কাল?
না আপু। এমনিতেই ঘুম আসছেনা।
আপু হাই তুলতে তুলতে বললেন, আমি গেলাম। তুমি দ্যাখো যা মনে চায়।
রিমোট দিয়ে আপু চলে গেলেন। মিতা কিছুক্ষণ খালি ঘরে শব্দশীল টিভির সামনে বসে থাকল। আসলেই দেখার তেমন কিছু নাই।
কিছুক্ষণ পর হঠাত মিতার কেমন গা ছমছম করতে থাকল। ভয় না ঠিক, কেমন যেন। টিভি অফ না করেই তাড়াতাড়ি কমন রুমে চলে আসল মিতা। কেন যেন বুক ধড়ফড় করছে।
তাড়াতাড়ি চকিতে উঠতে গিয়ে ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হয়ে গেল। পাশের চকি থেকে সুমনা ঘুম জড়ানো গলায় বলে উঠল,
'শারমিন, দরজা বন্ধ করে দিয়ে তারপর ঘুমাতে আয়। আর টেবিল ল্যাম্প বন্ধ কর। চোখে আলো লাগছে।'

[photo source: internet]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন