বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ, ২০১৬

দরকারী ক্লাস







চার তলায় সার্জারি ওয়ার্ডে ক্লাস। মোস্তফা মাহবুব স্যার ক্লাস নিবেন।উনি ছাত্র ছাত্রীদের দেরী করে ক্লাসে যাওয়া একদমই পছন্দ করেননা। অন্য স্যারদের মত ‘যাও, রুগীর হিস্ট্রি নাও’ বলে ওয়ার্ডের ভিতর ছাত্রদের আজাইরা ঘুরতে বলেননা।ঠিক পোণে দশটায় স্যার ওয়ার্ডের সারি সারি বেডের মাঝখান বরাবর  হাঁটাহাঁটি শুরু করেন।ধীরে ধীরে স্যারকে ঘিরে দাঁড়াতে থাকে ছাত্র ছাত্রীরা।স্যার তার গম্ভীর কিন্তু শ্রুতিমধুর স্বরে  পড়ানো শুরু করেন প্রত্যেকের চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন এবং প্রশ্ন করতে বলেন। কিন্তু বিশ মিনিট পরে ক্লাসে এসে কেউ তার লেকচারের লেজ ধরবে, তা হবেনা। উনি সেই ছাত্রকে জটলার মাঝখানে ডেকে নিয়ে আসবেন।বুলেটের মত একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকবেন। ছাত্র যখন নাস্তানাবুদ হয়ে ঘামতে থাকবে, তখন নিতান্ত অবহেলায় হাত ইশারায় তাকে চলে যেতে বলে থমথমে গলায় স্যার বলতে থাকবেন, he is not smart enough to attend my class in time!although his arrogance showed he knows everything!!
তবে উনি পড়ান মারাত্মক।ক্লাসে কোন বই খাতাও লাগেনা। সম্পূর্ণ লেকচার উনি মাথায় বসিয়ে দিতে পারেন। তাই উনার এই অপমান করাটুকু কেউ খারাপভাবে নেয়না।সেই জন্যই বলা যায়,ছাত্রদের কাছে তার আলাদা কোন নাম নেই। সবাই তাকে মোস্তফা মাহাবুব নামেই ডাকে।

এখনো আঠারো মিনিট বাকি আছে লেকচার শুরু হতে। মিতা বার বার ঘড়ি দেখছে। সকালের লেকচার শেষ করে মেয়েরা হোস্টেলে ফিরে আসে, হোস্টেলের ক্যান্টিনে নাস্তা করে, সেখান থেকেই একসাথে আবার ওয়ার্ডের ক্লাস করতে চলে যায়। কিন্তু আজ একটা মেয়েলি কারণে মিতাকে ডাইনিং থেকে দুইতলায় তার রুমে আসতে হয়েছে। শরীর খুব খারাপ লাগছে আজ, পা কামড়াচ্ছে আর দুইটা ওষুধ খেয়েও পেট ব্যথা বিন্দুমাত্র কমেনি, কিন্তু ওয়ার্ডে মোস্তফা মাহবুব স্যারের ক্লাস মিস দেয়া যাবেনা। মিতা তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নিল।
হাসপাতালের নিচতলায় দুই নম্বর লিফটের সামনে মহা গ্যাঞ্জাম লেগে আছে।শত শত লোকজন লিফটের সামনে।লিফটের উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে,’ এই লিফট শুধুমাত্র ডাক্তার এবং ছাত্র ছাত্রীর ব্যাবহারের জন্য’ কিতু রুগীর লোকজনকে আটকানো যাচ্ছেনা।মিতা ভিড় ঠেলে লিফটের কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করছে।ওর পরণে সাদা এপ্রন।লিফটম্যান মামা একবার ওকে দেখতে পেলেই ভীড় সরিয়ে ঠিকই ওকে লিফটে উঠিয়ে ফেলবে।
মিতার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা হঠাত উঁচু গলায় চিৎকার শুরু করল, এই সরেন, সরেন, সরেন!
ওর উচ্চকিত স্বরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও লোকজন সরে জায়গা দিতে থাকল।এখন লিফট্ম্যান মামা মিতা কে দেখেছে।সে মিতাকে লিফটে উঠিয়ে ফেল্ল।মিতার পাশে দাঁড়ানো চৌখুপি শার্ট পরা ছেলেটাও উঠেছে। লিফটের দরজা বন্ধ হতে হতে কোথা থেকে শিমু আপু ঢুকল। উনাদের প্রফের ভাইবা আগামী শনিবার থেকে। আপুরা  বোধহয় নাওয়া খাওয়া ঘুম ছেড়ে দিয়েছে।উনার কাঁধের ব্যাগ বই খাতার ভিড়ে ছিড়ে যাচ্ছে প্রায়। তিন তলায় শিমু আপু নেমে গেল।
চারকোণ খোপ খোপ হাফ হাতা শার্ট পরা ছেলেটা হঠাত বলে উঠল, কি রে মিতা, সারাখণ ভুরু কুঁচকে থাকিস কেন, বলত? তোর কি সারাক্ষণ মাথা ধরে থাকে নাকি?
মিতা হকচকিয়ে গেল। কে ছেলেটা? নাম ধরে ডাকছে কিন্তু ছেলেটাকে সে চিনতে পারছেনা।হকচকানোর আরো একটা কারণ হল, মিতাকে কেউ কখনো তুই করে ডাকেনা।ওর রুমমেটরাও না। ফার্স্ট-প্রফে পুরো ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড হওয়া মেয়েকে খুব কাছের মানুষ ছাড়া কেউ তুই করে ডাকতে পারেনা।
শ্যামলা করে ছেলেটা। কোঁকড়ানো চুল।মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মিতা চিনতে পারছেনা। সবচেয়ে বড় কথা হল, ছেলেটার পোষাক-আষাক খুবই অগোছালো এবং ময়লা। মনে হচ্ছে গত দুই তিন ধরে সে গোসল করেনি। শুধু গোসল করেনি তা না, সে তার জামা কাপড়ও বদলায়নি।
ছেলেটা তার উত্তরের আশায় চুপ করে বসে নেই।সে লিফট-ম্যান মামার সাথে গল্প করছে- তার আজ কতখন ডিউটি? নাইট শিফট হলে কি পরদিন ছুটি পাওয়া যায়? লিফট ম্যান হওয়ার যোগ্যতা কি?লিফট মেরেমত করাও কি জানতে হয় নাকি?  
ছয়তলা এসেছে। নিচের মত এত লোকজনের ভিড় নেই এদিকে। এটা আসলে সার্জারি পুরুষ ওয়ার্ডের পিছন দিক। সোজা গেলে রুগীদের কাঁটা-ছেড়া ড্রেসিং-ব্যান্ডেজ করার ‘প্রসিডিওর রুম’, তারপর স্যার দের চেম্বার। স্যারেরা বোধহয় তাদের চেম্বারের অংশের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে খুব কড়া।তাই এই দিকটা খুব পরিস্কার। দেখলেই মনে হয়, কিছুক্ষণ আগে বোধহয় সোয়াব দিয়ে মুছে নিয়ে গেছে। কয়েকটা পাতাবাহার গাছও আছে।
মিতা নেমে গেল।আর পাঁচ মিনিট আছে ক্লাসের। দ্রুত পায়ে হাঁটছে সে। টেনশনে পেটের ব্যথা গায়েব হয়ে গেছে।বা ওষুধ গুলি কাজ করছে এতখণে। কোঁকড়া চুলের ছেলেটাও নেমেছে।মিতার পাশে পাশেই হাঁটছে। ছেলেটার সাথে কোন বই খাতা নেই। দুই জনই ক্লাসে ঢুকল।না এখনো ছেলেটার নাম মনে পড়েনি ছেলেটার। অবশ্য সে মনে করতে চেষ্টাও করছেনা। নিশ্চয়ই খুব ফাঁকিবাজ, নয়ত ব্যাচের সবাইকে তো চেনেই মিতা।এ কে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ছেনা।
মোস্তফা মাহবুব স্যারকে ঘিরে ছাত্র-ছাত্রীরা জড়ো হতে শুরু করেছে। মিতা তাড়াতাড়ি ওদের সাথে মিশে গেল।শুধু মিশে গেল তাই না,মিতুল, টুম্পা সরে গিয়ে মিতাকে সবচেয়ে সামনে দাঁড়ানোর জায়গা করে দিল।
মোস্তফা মাহবুব স্যার এখন পারসেন্টেজ নিবেন।মিতা দেখল কোকড়া চুলের ছেলেটা রেজিস্ট্রার স্যারের রুম থেকে বের হচ্ছে।দুইজনে খুন চেনা মানুষের মত কথা বলতে বলতে হাঁটছে।রেজিস্ট্রার স্যার ছেলেটার কাঁধ চাপড়ে দিচ্ছেন আর ছেলেটা দন্ত বিকশিত করে হাসছে।ওর শুকনা ধুলাপড়া চোখ মুখ হাসিতে চিকচিক করছে।
হঠাত মিতার মনে পড়ে গেল, আরে এ তো সি বাচের শিহাব! কিন্তু শিহাবের এই অবস্থা কেন?
মোস্তফা মাহবুব স্যার পড়ানো শুরু করেছেন, আজকের টপিকটা খুবই দরকারী। কিন্তু শিহাব এই দরকারী ক্লাসের দিকে একবারো ফিরেও তাকালো না। রেজিস্ট্রার স্যারের সাথে হাসতে হাসতে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে গেল। 

[photo source: internet]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন