সোমবার, ৪ এপ্রিল, ২০১৬

ঝিলি

একহাতে শাড়িতে পেঁচানো পোটলায় গামছা,পুরানো দুইটা লুঙ্গির ত্যানা, একটা বড় কাঁথা, দুইটা পেটিকোট,আর আধাকেজি মুড়ি ভরা প্লস্টিকের ব্যাগ;  আর অন্যহাতে একটা স্টিলের ঢাউশ জগ হাতে রাশেদার মা যখন চরপাড়ায় বাস থেকে নামল, তখন বেলা দুইটা বেজে গেছে। বেনুর তালই সামনে সামনে হাঁটছে। রাস্তার ওইপারে হাসপাতালের বড় গেট দেখা যাচ্ছে। বেনুর তালই দেখতে দেখতে রাস্তা পার হয়ে গেল। তার হাত খালি। একবারও পিছন ফিরেও তাকায়নি।
রাশেদার মা ভিড় হট্টগোল আর বাস লেগুনা টেম্পুর মধ্যেই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বেনুর তালই কে এখনো দেখা যাচ্ছে। সে একভাবে হেঁটে বড় গেটের ভিতর ঢুকে পড়ল।

বাসেও সে বসেছিল একদম পিছনের ছিটে। আর রাশেদার মা তার পোটলা পাটলী নিয়ে মহিলা আর শিসশুর সাথে, 'ইঞ্জিলের' পাশে।
রাশেদার মা এর আগে দুই একবার এসেছে শহরে। অনেক আগে। তবে হাসপাতালে আগে কখনই আসেনি। তার শহর ভয় লাগে। সুকিকে অনেক সেধেছে সে, ল যাই। কিন্তু তার বাচ্চার জ্বর। আসলনা।
এত গাড়ি আর এত মানুষ চারদিকে। সে একপা আগায় আর দুই পা পিছায়। বেনুর তালই কখন ভিতরে চলে গেছে! রাশেদার মার হাত থেকে জগ পড়ে গড়াতে লাগল রাস্তায়।
কোত্থেকে এক চ্যাংড়া ছেলে এসে জগ তুলে দিল,হাত ধরে রাস্তা পার করে দিল। কিভাবে সে ভীড় হট্টগোল ঠেলে, মরা রুগী, বমি করা রুগী দেখতে দেখতে-- সরেন সরেন শুনে একবার ডানে আর একবার বায়ে সরে গিয়ে- গেট পার হয়ে ভিতরে চলে আসল, কিছুই বলতে পারবেনা সে।

বেনুর তালই বিড়ি ফুঁকছে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। রাশেদারর মা হেই হেই করে ডাকছে, কিন্তু বেনুর তালই ফিরেও তাকাচ্ছে না। সাথের চ্যাংড়া ছেলেটা এখনো সাথে সাথেই আছে, রাশেদার মা যদিও তাকে দেখতে পায়নি।

মাইঝলা মাইয়া জিলি ('ঝিলি)'র অবস্থা ভালোনা। হাসপাতালে ভর্তি। তাকে দেখতেই এত কষ্ট করে তারাগঞ্জ থেকে এসেছে রাশেদার মা। কিন্তু সত্যি বলতে, জিলির অবস্থার চেয়ে এখন তার নিজের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে বেশি ভয় হচ্ছে।

যাকে বেনুর তালই ভেবে হেই হেই করে দৌড়ে এসেছে এতখণে, কাছে এসে দেখে সে অন্য লোক।

রাশেদার মা-র গলা শুকিয়ে গেল।এত মানুষের মাঝে কোথায় কি খুঁজে পাবে সে?

পাশের ছেলেটা, নীরেট মুখে তাকিয়ে আছে রাশেদার মা-র দিকে।চোখে মুখে যদিও কোন ভাব ভঙ্গী নেই, চোখের পলকও ফেলছেনা, গলার সবোরে মধু ঢেক্লে বল্ল, কুনো যাইবাইন?

মাইয়া বরতি।
-কুন ওয়ার্ড?
বাচ্চা অইব। জিলি নাম।
-চলেন।

রাশেদার মা দাঁড়িয়ে থাকে।আকুল হয়ে বেনুর তালই কে খুঁজতে থাকে। ছেলেটা মিহি গলায় অলছে,
-চাচী, আইয়েন, আমার বইনও বরতি। গাইনী কেস।

রাশেদার মা হাঁটে। মনে হয় চিকন বারান্দায় মানুষের ঢলের সাথে একাই এগোচ্ছে। কিন্ত, কোনদিকে- জানেনা সে।

জটলা ঠেলাঠেলি শেষে হঠাত বড় খোলা বারান্দায় এসে পড়ে রাশেদার মা। এই দিকট খোলা, মাঠ আছে, অনেক আলো। রাশেদার মা বুক ভরে দম নেয়। পায়ে ঢল ঢল করছে পুরানো চপ্পল। পাশে পাশে ছেলেটা কুজো হয়ে হাঁটছে। রাশেদার মা যদি দেখেনি, ছেলেটা একবারও পলক ফেলেনি। মাছের মত বড় গোল গোল ধারালো চোখে সে সব দেখছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে দেখে নিচ্ছে রাশেদার মা কে।

সামনের গেট বন্ধ।গেটের কাছে আবার জটলা।গেটের পাশে বসা পুলিশ কাউকেই ঢুকতে দিচ্ছেনা। পুলিশটার সাথে কিছু নেই, শুধু ওর খাকি পোষাকটা দেখেই রাশেদার মা-র গলা শুকিয়ে গেল।

সাথের ছেলেটা রুগি আছে রুগী আছে বলতে বলতে ভিতরে ঢুকে গেল। রাশেদার মা আবার জটলার পিছনে পড়ে গেল। মানুষগুলি সবাই একসাথে কথা বলছে। মাথা ভন ভণ করছে রাশেদার মার।

সাথের ছেলেটা গেটের খোপ খোপ গ্রীলের ওইপাশে ফিরে এসেছে- চাচী? চাচী?
উদ্ভ্রান্তের মত তার দিকে ছুটে যায় রাশেদার মা।
-নাম না কি?
 জিলি! জিলি!

বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকে রাশেদার মার। ছেলেটা আবার চলে গেল।

এই জায়গায় বেনুর তালই কে খোজার কোন মানে হয়না। তবু যদি খুঁজে পায়- সেই আসায় রাশেদার মা চোখ বড় বড় করে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকল।
ছেলেটা গেটের এইপাশে চলে আসছে। চাচী? আপনের রুগী রে অপ্রেশনে নিছে।

কয় কি ছেলে? বোচকা আর জগ হাত থেকে পড়ে যেতে নেয় রাশেদার মায়ের।
ছেলেটা একভাবে তাকিয়ে থেকে বলে, ওষুধ আনতে কইছে, এই লন লিস্ট। এক্টুকরা কাগজ এগিয়ে দেয় তার দিকে।

কাগজ নিয়ে কিছুখণ যেন পাথর হয়ে থাকে সে, তারপর হঠাত মরিয়ার মত ওয়ার্ডের বন্ধ গেটের দিকে ছুটে যেতে থাকে রাশেদার মা।ওষুধ কোত্থেকে আনবে সে?

ছেলেটা ডাকে, চাচী, নিরাশ হোয়েন না।আমার বইনেরও অপ্রশন করছে। এলা সুস্ত আছে।

বলে নিস্পলক ছেলেটা ঘুরে ভিড়ের দিকে চলে যেতে থাকে।
রাশেদার মা বাপ গো,বাপ বলে ডেকে উঠে। বাবা, আমারে ওশুধডি আইন্না দেন

-আইচ্ছা, দেন, আনি।

রাশেদার মা চোখ মুছে। কাঁপা হাতে আচলের গিঁট থেকে একশটাকার নট তার হাতে দেয়। কাগজটা নিয়ে ছেলেটা ভীড়ে মিশে যায়।

হথাত গেট খুলে দিয়েছে পুলিশটা। মানুষের ঢলের সাথে ওয়ার্ডের ভিতর ধুকে যায় রাশেদার মা। বাইরে বিকালের রোদ মরে যাছে এখন।
সারা ওয়ার্ডের সমস্ত বিছানা, মাটিতে আর বারান্দায় সারি সারি রুগীর মাঝে তন্ন তন্ন করে খুজেঈ নিজের ম্যেকে খুঁজে পায়না সে। কয়েকজন বলে, শিষ্টার কে জিগান। শিশটারকেও  রাশেদার মা খুঁজে পায়না। বারান্দায় পওটলা ফেলে তার উপর বসে কপাল চাপড়ে বিলাপ পারতে থাকে সে। তখন গেটের ওইপাশে দেখে বেনুর তালই। নাকি আবার ভুল দেখছে রাশেদার মা? অতকিছু মাথায় আসেনা। পাগলের মত ছুটতে ছুটতে যায় গেটের কাছে। হেই হেই করতে করতে।

না। এইবারও ভুল। অন্য মানুষ।

পিছন থেকে কে যেন খিস্তি দিয়ে উঠছে, শইল্যের উপ্রে পইরা যান ক্যারে? চউখ কুন দিকে? কানির ঘরের কানি, ঠাং ডা চেটকাইয়ালছে!

রাশেদার মা পিছনে তাকায় না। সে ই না দেখে দৌড় দিতে গিয়ে মহিলার পা মাড়িয়েছে।

মহিলা ঠিওকই পিছন পিছন চিৎকার করতে করতে আসে। একটানা জেরা করেই চলেছে। রাশেদার মা চুপ।
মুখোমুখি এসে চিৎকার জুড়ল মহিলা, অহন রাও করেন না ক্যা?
- কি কয়াম? দেখছিনা। অত মুখ করুইন ক্যা?

চিৎকার বন্ধ করে চোখ পিটপিট করছে মহিলা।
-তারাগঞ্জের থে আইছুইন?
হ।

-আমেনা রুগীর ঠাইন?
জিলি। জিলি নাম।
-আমেনা না? জিলি? জিলি নাম?
হ। আমার মাইয়ার নাম জিলি।

মোটা মহিলা চলে গেল।রাশেদার মা বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। সে আর নাই।

মোটা মহিলাটা, রঙ চং ছাপা শাড়ি কুচি করে পাট পাট করে পরা,চুলে জব্জব করে তেল দিয়ে টেনে বাঁধা, কিছুখন পর এসে কাঁধে টোকা দিয়ে বল্ল,
আইন যে। আপনের মাইয়ারে বরতি দিছে আমেনা নামে।আইন যে এই দিকে।


বোচকা সহ, ঢলঢলে চপ্পল পায়ে থপ থপ  করতে করতে, রাশেদার মা, মোটা মহিলার পিছন পিছন ওয়ার্ডের ভিতরের বারান্দা ধরে হেঁটে যেতে লাগল। বারান্দাটা আলো আধারী ভরা। সব শদব দুইবার দুইবার করে সোণা যাচ্ছে, আর কথা গুলোও গমগম করছে। অনেক দূরে আরেকটা খোপ খোপ গেট। বন্ধ।হাঁটতে হাঁটতে দূরের ছোট্ট গেটটা চোখের কাছে আসতে থাকল। রাশেদার মা ভয়ে, ঘাড় না ঘুরিয়ে চোরা চোখে চারপাশ দেখছে। আবার তার বুক ঢিপঢিপ করছে।

মোটা মহিলাটা তাকে গেটের বাইরে রেখে আরো ভিতরে চলে গেছে। রাশেদার মার মনে হচ্ছে সে কোন এক গভীর কুয়ায় পড়েছে। দিনের আলো সে বুঝি আর দেখতে পাবেনা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।

এই গেটের পাশেও পুলিশ। পাশে দুইটা লোক। একজন গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল। কই আছলেন?
চমকে উথে রাশেদার মা তাকিয়ে দেখে, বেনুর তালই। মোটা মহিলা ফিরে এসেছে। রাশেদার মা বেনুর তালইওকে কিছু বলার সুযোগ পেলনা। মহিলা বোধহয় হাসপাতালের আয়া। ইচ্ছামত ঢুকছে বের হচ্ছে, কেউ তাকে আটকাচ্ছেনা।
মহিলা একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বল্ল, অপ্রেশনে নিছে। অবস্থা খারাপ। টিপ দ্যান ।টিপসই লাগব। রক্ত আনছুইন?

মহিলার পিছিনে অল্প বয়স্ক পরীর মত সুন্দর এক ডাক্তরনী।  মায়াবী মুখটা কিন্তু কথা বলছে খুব ধারালো গলায়,

আপনারা এতখণে এসেছেন? রক্ত এনেছে?রুগী খুবই খারাপ। রক্ত ছাড়া অপারেশন হবেনা। রক্ত এনেছেন? রক্ত?

রাশেদার মা ডাক্তরনীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা কোথাও সে বুঝেনি। মোটা আয়াটা ডাকত্রনীর সাথে সাথে বলছে, অবস্তা বালা না। রক্ত লাগব।

বেনুর তালই এর দিকে তাকালো রাশেদার মা। মোটা আয়াটা বলে, টিপ দ্যান।নেন। এই যে রক্তের কাগজ।এই যে ওষুধের লিস্ট। তাড়াতাড়ি করেন। নাইলে বাচত না।

ওষুধের লিস্ট কথাটা শুনে রাশেদার মার গেটে আলাপ হওয়া ছেলেটার কথা মনে পড়ল। কই গেল ছেলেটা আর তো আসল না! ওষুধ কি এনেছে? তাকে কোথায় খুঁজে পাবে? ততখণে তা মাইঝলা মাইয়া জিলি তো মরেই যাবে!
রাশেদার মা ধুপ করে মাটিতে পড়ে গেল। অস্ফুট সবোরে তার  মুখ থকে বিলাপ শুনা গেল, জিলি! জিলি! জিলি!!





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন