প্রথম খন্ড
---------
আমি কয়েক বার ভাবছি, আমার জীবনের কাহিনী লিখব। মানে প্রেমের। বিয়ের। কিন্তু লিখতে গিয়ে থেমে গেছি। আমার কাহিনী ঠিক প্রেমের না।
প্রেমের কাহিনী যদি শুনতে চাও আপুরা, তাইলে আমার হিশটরী শুনো। কঠিন প্রেমে পড়ছিলাম। একেবারে দম বন্ধ করে প্রেম। সারাদিন বুকের ভিতর চাপ দিয়ে থাকত। হাসতেও ইচ্ছা করতনা। কারণ বলতে পারতাম না। মনে মন ভাবতাম, একটা মিরাকল ঘটুক। আমি সব বলে দেই। বলে দিয়ে ভার মুক্ত হুই।
আমি ছিলাম হেড-মিস্ট্রেসের মেয়ে। ভাল ছাত্রী। পড়ুয়া। কথা কম বলি। মিশতে পারিনা। ক্লাসের এক ভাল ছাত্র প্রায়ই আমারে ফোন দেয়। এই, ক্লাসের রুটিন কি? নোট কি দিছে? স্কুলে গেছিলা? যাও নাই কেন? এইসব। ক্লাস এইট- নাইন। ছেলেটা বিরাট ভদ্র। বিরাট গুণী। গান জানে। আবৃত্তি জানে। নানান পুরস্কার পায়। পিউর শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। কেউ যদি ফোন ধরে, সে কোমল গলায় বলে, সিঁথিকে কি একটু দেয়া যাবে?
ওর ফোন আসলেই আমার হার্ট-বীট বেড়ে যেত। গাল লাল হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে যেত। তোতলাতে থাকতাম। এমনকি ওর ফোন আসার সময় হলে, মানে সন্ধ্যায় আমার এমন পালপিটিশন হত, যে, মনে হত আজকে মরেই যাবো।
যেদিন স্কুলে লাস্ট বার গেলাম, বান্ধবী, বন্ধু কাওকে আমার মনে নাই। সে মাঠের ওইপাড়ে একটা দেয়ালে হেলান দিয়ে হাটু ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি মাঠের এই পার থেকে তাকে দেখতেই থাকলাম, দেখতেই থাকলাম। মনে হল, এই তো শেষ। আর আমাদের দেখা হবেনা।
আমি ওর চেয়ে ভালো রেজাল্ট করলাম।
সে ঢাকার কলেজে ভর্তি হল।
আমার কলেজ ভাল লাগেনা। যে আমি আর কিছু নাম্বার পেলে স্ট্যান্ড করতাম, সে পড়ালিখা ছেড়ে দিলাম। ঘুমাই। আর যতখন জেগে থাকি, খালি রাগ করি, চিল্লাই।কলেজে যাইনা। কিছু ভালোলাগেনা। বুকে দম বন্ধ হয়ে আসে। কোচিঙে ভর্তি হলাম। সেখানের স্যার আমার আব্বাকে ডেকে পাঠালেন। জানতে, আমার কি কোন সমস্যা আছে? আমি কি কোন ইমোশনাল স্ট্রেসের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি?
স্যার আমার চোখে মুখে হতাশা, কষ্ট, কান্না দেখতে পেয়েছিলেন। মা বাবা পান নাই। অবশ্য আমার বাবা মা খুবই বন্ধুবৎসল। বুঝলেও হয়ত চেপে গেছেন।
ফাইনাল পরীক্ষার সময় আমার পক্স হোলো। সিক বেডে পরীক্কা দিলাম। তার পরেও ছেলেটার চেয়ে বেশি নম্বর পেলাম।
কিভাবে কিভাবে যেন এতদিন পর সে আবার উদয় হয়েছে। আমাকে ফোন করে আমার পরীক্ষার নাম্বার কত জানতে চেয়েছে। শুনে বল্ল, চার হাত দূর? ( আমি ওর থেকে চার নাম্বার বেশি পেয়েছি)
সেইদিন গেল কানতে কানতে। মনে হচ্ছিল, চার হাত না, আমি কোটি কোটি মাইল দূর। কেন সেইটা সে বুঝেনা।
ভারসিটির ফর্ম তুলব। ওর বাবা আর আমার বাবা বন্ধু-প্রায়। দুইজনের মা ই টিচার। গারজিয়ানরা ঠিক করল, একসাথে ফর্ম ফিলাপ, ভাইবা, এইসব করবে। তাইলে দুই ফ্যামিলিরই সুবিধা। আমার এইদিকে আবার হার্ট এটাক। কিন্তু পরে আর একসাথে কিছু করা হয়নাই।
আমি চান্স পেলাম বরিশাল। সে ময়মনসিংহ মেডিকেল। আবার আমার কান্দন শুরু। কেউ ই জানেনা তখনো। বাসায় এসে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকি ওর ছুটির সময়। আমাদের বাসার সামনেই বড় রাস্তা। সে দেখে খুশি হয়ে একদিন হাত নাড়ল
এইভাবে আরো কয় বছর গেল
একবার আমি ছুটিতে বাসায় আসছি। কি বৃষ্টি। তখন আমার মোবাইল আছে। হঠাত রাতে মেসেজ, তোমার বাড়ির ছাদে আজ সারাদিন বৃষ্টি। এমন দিনে আর যাই হোক, পড়তে মন চায়? হোক না যতই প্রফ!
প্রফ হল মেডিকেলের ইয়ার ফাইনাল। আমার সামনে ইয়ার ফাইনাল। আমি সন্দেহ করতেছি, আশা করতেছি, এইটা ওর মেসেজ। কিন্তু শিউর না।
মার ফোন থেকে ফোন দিলাম, কে? নাম কল্ল, আমি ক। আমি রাগে দুঃখে চিৎকার করে বল্লাম, কোন ক?!!
অনেক কথা হল। ওরে সারারাত মেসেজ পাঠাইলাম, সে ও রিপ্লাই দিল।
gf আছে?
-নারী, বাড়ি আর গাড়ি, এই তিনের সাথে আমার আজীবন আড়ি
চলে গেলাম। ওরে টিঠি লিখে যা আছে কপালে নাম নিয়ে পোস্ট করে দিলাম। উত্তর মনে হয় দিছিল। সত্যি ভুলে গেছি,
এরপর ওরে ফোন দেই। আমি একশ কথা বলি। সে আগের মতই নরমাল। একদিন বলেই ফেললাম, তুমি কি আসলে বুঝতে পারছ, আমি তোমার প্রেমে পড়ে আছি? তোমার জন্য আমার অনেক অনেক অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে পারতেছিনা। প্লিজ তুমি কি বলবা, তুমি কি আমাকে পছন্দ কর?
ও ততদিনে বুঝে গেছে। যদিও সরাসরি হ্যাঁ না কিছু বলেনাই। বেচারা বিপদে পড়ে আমতা আমতা করতে লাগল। বল্ল, দ্যাখো সিঁথি, আমি সত্যিই এইভাবে কখনো ভাবি নাই। আমরা তো ছোটবেলার বন্ধু।
এক দুই বার বাসায়ও গিইয়েছিলাম। একবার বলেছি, তুমি কি আমার হাতটা একটু ধরবে?
ও ধরেনি।
আমি পাগলামি করলেও সে তার বন্ধুত্বের সম্মান রেখেছে। কখনো আমাকে হার্ট করে কিছু বলেনি। আমি ফোন করতেই থাকতাম, করতেই থাকতাম। ফোন ধরলে চিৎকার করতাম। ওর জন্মদিনে পেত্নীর মত (মানে জমকালো) সেজে ওকে ফোন দিলাম। আমার রুম মেট আমার পাগল দশা দেখে একদিন ওর সাথ ফোনে কথা বল্ল। বল্ল, ভাই ও তো পাগল হয়ে যাচ্ছে আপনার জন্য। কিছু বলেন।
তবুও সে প্রফে ফেল করল, আর আমি পাশ করলাম।
বুঝলাম, আমার কাছে পড়ালেখার কম্পিটিশনটা এতই বেশি জরুরী, যে, আমি ওর কাছে পরীক্ষাতে হেরে যেতে পারবনা। ডাক্তারদের লাইফ সারাজীবনের পড়ালেখা। ও যদি কোন পরীক্ষায় আমার চেয়ে বেশি নাম্বার পায়, আমি ওকে খুনই করে ফেলব
তারপর একদিন কিভাবে কিভাবে যেন মনের ভিতর পরিবর্তন হতে থাকল। বলে দিয়েছি। সে না করেছে। আমার সব রুদ্ধ আবেগ ঢেলে দিয়েছি। আমি আর আগাতে চাইনা। ওকে এখন যেতে দেই। আমিও মুক্ত হই। এই সম্পর্কের ভার আমি আর টানতে পারছিনা।
চোখ মুছে বই নিয়ে বসলাম। প্রতিদিন পড়ালেখা করি। ডুবি, ভাসি। শান্তি পাই।
মাস তিনেক পর হঠাত আমি অকে ফোন করলাম। কারণ আমার ওকে সব বলে দেয়া উচিত। বল্লাম, আমি আর তোমাকে ফোন করবনা। সব ডায়রি (যেগুলোতে আমার চোখের জলে ভাসা কাহিনী ছিল) ওর চিঠির উত্তর আমি পুড়িয়ে ফেলেছি। সত্যি পুড়িয়েছিলাম। বল্লাম, আমার মনের চিকিৎসা আমি নিজেই করেছি
ও চুপচাপ শুধু শুনল।
আমি একবারে ফাইনাল প্রফ পাশ করলাম। এটা অনেক কঠিন। ইন্টারনী শুরু করলাম।
আমি ওকে ভুলে গেলাম।
তখনকার অনুভূতি পাগলামী কে যদিও দগদগে ঘা মনে হয়, তবুও এইটাই আমার প্রেমের গল্প। জীবনেও এই কাহিনী আমি ভুলে যাবোনা। এখনো কোন কারণে আমার হাজবেন্ডের সাথ দুই একদিন আমার মন কষাকষি চলে, আমি ওকে স্বপ্নে দেখি। দেখি, আমি ফোনে কথা বলছি, এত চাচ্ছি যেন সে আমার সাথে কথা বলুক, কিন্তু ও খুব দায়সারা হু হ্যাঁ বলছে। ফোন রাখে দিচ্ছেনা, তবু বুঝতে পারছি, ও আমার সাথে একদমই কথা বলতে চাচ্ছেনা
২য় খন্ড
---------
আমার তখন মেডিসিনে প্লেসমেন্ট। জাকির স্যারের ইউনিট। মানে ইউনিট ওয়ান। অসম্ভব কড়াকড়ি। রুগী ভর্তির দিন হোক বা এমনি সাদারণ দিন, অনেক অনেক কাজ। সকাল আটটা থেকে ওয়ার্ডে যাই। রুগী দেখে যাই ওয়ার্ডের সেমিনার রুমে। দেড় দুই ঘন্টা ধরে মর্নিং সেশন চলে। নতুন কেস প্রেসেন্টেশন, রুগী কিভাবে পরীক্ষা করে দেখা যায়, নতুন নতুন টপিক। সে এক চাঞ্চল্যকর অবস্থা। যদিও আমি মাত্র ইন্টার্ন, তবু নিজেই কয়েকটা কেস প্রেজেন্ট করে ফেললাম। একদিন প্রফেসর জাকির স্যার (সিনিয়রদের) বলেই বসলেন, দ্যাখো তোমরা এই ভাবে ওর মত কনফিডেন্টভাবে প্রেজেন্ট করতে পারলেই (2nd part) পাশ।
আমার খুশি দেখে কে। স্যারের মহা ভক্ত হয়ে গেলাম। নিজেকে আগে থেকেই ছেলেদের সমকক্ষ ভাবতে পছন্দ করতাম্ আর এখন পরিশ্রম করা বহুগুণে বাড়িয়ে দিলাম।
রুগী ভর্তি দিনগুলিতে ডিউটির সময়ের বাইরেও ওয়ার্ডে পড়ে থাকতাম। নিজের গরজে অন্যের প্রেজেন্টেশন রেডি করে দিতাম। এক পৃষ্ঠা ডেভিডসন পড়ে এসেও এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতাম স্যারদের, ওনারা মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকত। এই জিনিস কোথায় পেলা?
ফিফথ ইয়ারের পিচ্চিরা ঘুরঘুর করলে ওদের জড়ো করে পড়াতে শুরু করতাম। বা আসতে যেতে লাগিয়ে দিতাম, ১৩ নম্বরের রুগীর heart sound শুনে এসে বলো কি কি পাও? ১০ এর রুগীর হাতের আঙ্গুল গুলি দেখেছ?
পিচ্চিরাও আমার পিছনে ঘুরঘুর করত। আপু পড়ান পড়ান।
তখনকার মেয়ে ইন্টার্নরা কখনো ছাত্রদের পড়াতো না। আমাকে অনেকে মনে রেখেছে এইজন্য। এখনো ফেসবুকে আমাকে ট্যাগ দিয়ে পোস্ট দেয়, আপুর কাছে প্রথম রুগী দেখা শিখেছি।
ডিউটি রুমের টেবিলে প্রতিদিনের নতুন কড়কড়া পত্রিকা পড়ে থাকত সারাদিন, কারোই সেটা পড়ার ও সময় হোতোনা।
এমন কর্মময় একটা সময়ে আমাকে ম্যা ফোন করে বাসায় আসতে বল্ল। আমাদেরই এক অনেক দূরের লতায় পাতায় আত্মীয়ের ছেলে ডাক্তার। সে পাত্রী খুঁজছে। মনু ফুপুর মেয়েও ডাক্তার? তাইলে আর বাইরে দেখার দরকার কি? ওরা আমার ছবিও দেখেছে। এখন সামনা সামনি দেখতে চায়।
আমি বাসায় আসলাম। শুক্রবার সকাল সকাল গোসল করে আমার মামাতো বোন আর দুলাভাইয়ের সাথে আরেক ভাইয়ের মেগা-শপে গেলাম। শহরে আমার ভাইদের বড় বড় দোকান আছে।
ছেলে বলেছে, বাসায় দেখবেনা। দোকান টোকান হলেই হয়। পাত্র আর তার বড় বোন এসেছে। বর বোনের মাথায় ইয়া ঢাউশ একটা রংচঙ্গা ক্লিপ কিভাবে যেন লাগানো। আর মুখটা এমন করে রেখেছে, যেন দোকান বা দোকানের জিনিস, আকাশ বাতাস বা অক্সিজেন, কোন কিছুই তার পছন্দ হচ্ছেনা।
আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কোন সাবজেক্টে পড়ি?
আমি বুঝলাম, এই মহিলার ডাক্তারী পড়া নিয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান নাই। আমি বল্লাম, আমি সার্জারি তে ক্যারিয়ার করব, এটাই আমার স্বপ্ন। সে বল্ল, গাইনীতে করা যায়না? মেয়েরা তো গাইনী পড়ে। আমি বল্লাম, না আমার সার্জারি ভাল লাগে। আমি সার্জারিতেই পড়ব। তবে চাইলেই তো আর সার্জন হওয়া যায়না। দেখা যাক!
ছেলেটা ও দেখি আমার মতই দোকানের জিনিস্ পত্রের দিকে বিরাট মনোযোগ। বেশি লম্বা না। সরু সরু পাতলা পাতলা খোঁচা খোঁচা টাইপ চুল। চোখে চশমা পরা। ফুলহাতা শার্ট পরা।সাদা রঙের। আমি হাইট টাইট কিছুই ভাবছিলাম না, ভাবছিলাম, চশমা পরা একটা ছেলেকে বিয়ে করব? এটা তো কখনই ভাবিনাই।
একজন জিজ্ঞেস করল, ছেলের সাথে কথা বলবি?
আমি সরাসরি হ্যাঁ না বলতে পারলাম না, বল্লাম, আমার কোন অসুবিধা নাই (বলতে)।
সে ভেবেছে, আমি কথা বলতে চাইনা।
ঘোরের মধ্যে বাসায় আসলাম। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমার সাথের মামাতো বোন জিজ্ঞেস করেছে, ছেলে কি পছন্দ হয়েছে? আমি হু হ্যাঁ কিছু না বলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। আমার সমস্ত শরীর কাঁপছিল। আমার বোনটাও চোখ লাল করে কান্না শুরু করল। আমাদের এই খানদানী কান্নায় আমার মা ও যোগ দিল। আমি বলতে চাচ্ছিলাম, যদি আমার মা-র পাত্র পছন্দ হয়, তাহলে আমি রাজি।
আচ্ছা ছেলের বাবা কোত্থেকে আসল, মনে করতে পারছিনা, বোধহয় বিকালে আবার বাবাটাও এসেছিল। পাত্র আসেনাই। তখন স্বাভাবিক গলায় কথা বলেছি।
ওরা চলে গেল। বল্ল জানাবে।
আমি বাসায় একদিন আরো বেশি থাকলাম। কিছু জানায়না। চলে আসলাম।
এইদিকে ওয়ার্ডে চরম একটিভ সিঁথি নাই তিন দিন।। অলরেডি রটে গেছে সিঁথির বিয়ে। কাওকে দাওয়ত দেইনাই, এই বিষয়ে কিছু বলিনাই, কেউ সরাসরি কথা শুরু করতে পারছেনা।
আমি তখন জানতা চাইলাম, আচ্ছা ছেলের ডিগ্রী কি? সে নাকি সরকারি চাকরিতে অন্য কোথাও পোস্টিং না পেয়ে গাইনীতে জয়েন করেছিল। এক বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাইয়া, পিজিটি কি?
ভাইয়া হাসতে হাসতে বল্ল, এইগুলা কিছু না। কেন? কে বলছে, সে পিজিটি?
এত খারাপ লাগছিল, যে এমন একটা বাইট্টা, চশমু, ডিগ্রী ছাড়া মানুষের কাছে নিজেকে বিচারের ভার দিয়েছি, সে নিজেও জানেনা সে নিজে কি,আর আমি কি
আরো দিন দুই গেল। মা বল্ল, তুই আবার মন খারাপ করিসনাই তো? ওরা তো সরাসরি কিছু বলছেনা। মনে হয় 'না'। আর ভাসা ভাসা শুনলাম, ছেলের বোন বলেছে, মেয়ের মুখ বড়।
আমি অবাকের ওইপাড়ে চলে গেলাম। মুখ বড়? আমার যে মুখ বড় না কি, এইটা তো ওরা আগেই জানে। এইভাবে বলার মত বাজে নাকি আমি দেখতে?
রাগ হোলো। কষ্ট পেলাম।
তারপর কষ্টটা বার বার নিজেকেই আঘাত হানতে লাগল। আমার এত পরিশ্রম করে অর্জন করা আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদা কোথাকার কোন চকচকা ক্লিপ পরা অশিক্ষিত কদর্য মহিলা আর তার বোবা ভাই ভেঙ্গে গুড়া গুড়া করে দিল। হঠাত আমি বন্ধুহীন হয়ে গেলাম। অন্যের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখতে শুরু করলাম। জানি সবই শুনতে খুব হাস্যকর শোনাবে, কিন্তু আমি যেন একদম অস্তিত্ব হীন হয়ে যেতে থাকলাম।
মনে হতে থাকল, সব ছেলেরা আর তাদের বোনেরা আমাকে এইভাবেই দেখছে। আমাকে অনেক ছলা কলা করে এখন একটা বর জুটাতে হবে।
হয়ত এই ভারী ভারী বইয়ের বিদ্যা আর জ্ঞানের জায়গা এই বই পর্যন্তই। ওয়ার্ড ভর্তি এইসব রোগ ভরা মানুষগুলো আসলে আমার জীবনের কোন অংশ না। ছোটদের শিখিয়েও লাভ নাই, কারণ, সেও আমার প্রতিযোগি।
আমাকে দেখে যে টাকা দিয়ে গিয়েছিল, সেই টাকা দিয়ে বিসিএস গাইড কিনলাম। হাঁচড়ে পাঁচড়ে অস্তিত্ব নিয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা।
আর যখন সেই চেষ্টা অর্থহীন মনে হত, কান্না পেত, ভিতরটা জ্বলত,তখন অদ্ভুত শিশু সুলভ একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খেত, আমাকে কেউ ভালোবাসেনা।
---------
আমি কয়েক বার ভাবছি, আমার জীবনের কাহিনী লিখব। মানে প্রেমের। বিয়ের। কিন্তু লিখতে গিয়ে থেমে গেছি। আমার কাহিনী ঠিক প্রেমের না।
প্রেমের কাহিনী যদি শুনতে চাও আপুরা, তাইলে আমার হিশটরী শুনো। কঠিন প্রেমে পড়ছিলাম। একেবারে দম বন্ধ করে প্রেম। সারাদিন বুকের ভিতর চাপ দিয়ে থাকত। হাসতেও ইচ্ছা করতনা। কারণ বলতে পারতাম না। মনে মন ভাবতাম, একটা মিরাকল ঘটুক। আমি সব বলে দেই। বলে দিয়ে ভার মুক্ত হুই।
আমি ছিলাম হেড-মিস্ট্রেসের মেয়ে। ভাল ছাত্রী। পড়ুয়া। কথা কম বলি। মিশতে পারিনা। ক্লাসের এক ভাল ছাত্র প্রায়ই আমারে ফোন দেয়। এই, ক্লাসের রুটিন কি? নোট কি দিছে? স্কুলে গেছিলা? যাও নাই কেন? এইসব। ক্লাস এইট- নাইন। ছেলেটা বিরাট ভদ্র। বিরাট গুণী। গান জানে। আবৃত্তি জানে। নানান পুরস্কার পায়। পিউর শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। কেউ যদি ফোন ধরে, সে কোমল গলায় বলে, সিঁথিকে কি একটু দেয়া যাবে?
ওর ফোন আসলেই আমার হার্ট-বীট বেড়ে যেত। গাল লাল হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে যেত। তোতলাতে থাকতাম। এমনকি ওর ফোন আসার সময় হলে, মানে সন্ধ্যায় আমার এমন পালপিটিশন হত, যে, মনে হত আজকে মরেই যাবো।
যেদিন স্কুলে লাস্ট বার গেলাম, বান্ধবী, বন্ধু কাওকে আমার মনে নাই। সে মাঠের ওইপাড়ে একটা দেয়ালে হেলান দিয়ে হাটু ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি মাঠের এই পার থেকে তাকে দেখতেই থাকলাম, দেখতেই থাকলাম। মনে হল, এই তো শেষ। আর আমাদের দেখা হবেনা।
আমি ওর চেয়ে ভালো রেজাল্ট করলাম।
সে ঢাকার কলেজে ভর্তি হল।
আমার কলেজ ভাল লাগেনা। যে আমি আর কিছু নাম্বার পেলে স্ট্যান্ড করতাম, সে পড়ালিখা ছেড়ে দিলাম। ঘুমাই। আর যতখন জেগে থাকি, খালি রাগ করি, চিল্লাই।কলেজে যাইনা। কিছু ভালোলাগেনা। বুকে দম বন্ধ হয়ে আসে। কোচিঙে ভর্তি হলাম। সেখানের স্যার আমার আব্বাকে ডেকে পাঠালেন। জানতে, আমার কি কোন সমস্যা আছে? আমি কি কোন ইমোশনাল স্ট্রেসের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি?
স্যার আমার চোখে মুখে হতাশা, কষ্ট, কান্না দেখতে পেয়েছিলেন। মা বাবা পান নাই। অবশ্য আমার বাবা মা খুবই বন্ধুবৎসল। বুঝলেও হয়ত চেপে গেছেন।
ফাইনাল পরীক্ষার সময় আমার পক্স হোলো। সিক বেডে পরীক্কা দিলাম। তার পরেও ছেলেটার চেয়ে বেশি নম্বর পেলাম।
কিভাবে কিভাবে যেন এতদিন পর সে আবার উদয় হয়েছে। আমাকে ফোন করে আমার পরীক্ষার নাম্বার কত জানতে চেয়েছে। শুনে বল্ল, চার হাত দূর? ( আমি ওর থেকে চার নাম্বার বেশি পেয়েছি)
সেইদিন গেল কানতে কানতে। মনে হচ্ছিল, চার হাত না, আমি কোটি কোটি মাইল দূর। কেন সেইটা সে বুঝেনা।
ভারসিটির ফর্ম তুলব। ওর বাবা আর আমার বাবা বন্ধু-প্রায়। দুইজনের মা ই টিচার। গারজিয়ানরা ঠিক করল, একসাথে ফর্ম ফিলাপ, ভাইবা, এইসব করবে। তাইলে দুই ফ্যামিলিরই সুবিধা। আমার এইদিকে আবার হার্ট এটাক। কিন্তু পরে আর একসাথে কিছু করা হয়নাই।
আমি চান্স পেলাম বরিশাল। সে ময়মনসিংহ মেডিকেল। আবার আমার কান্দন শুরু। কেউ ই জানেনা তখনো। বাসায় এসে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকি ওর ছুটির সময়। আমাদের বাসার সামনেই বড় রাস্তা। সে দেখে খুশি হয়ে একদিন হাত নাড়ল
এইভাবে আরো কয় বছর গেল
একবার আমি ছুটিতে বাসায় আসছি। কি বৃষ্টি। তখন আমার মোবাইল আছে। হঠাত রাতে মেসেজ, তোমার বাড়ির ছাদে আজ সারাদিন বৃষ্টি। এমন দিনে আর যাই হোক, পড়তে মন চায়? হোক না যতই প্রফ!
প্রফ হল মেডিকেলের ইয়ার ফাইনাল। আমার সামনে ইয়ার ফাইনাল। আমি সন্দেহ করতেছি, আশা করতেছি, এইটা ওর মেসেজ। কিন্তু শিউর না।
মার ফোন থেকে ফোন দিলাম, কে? নাম কল্ল, আমি ক। আমি রাগে দুঃখে চিৎকার করে বল্লাম, কোন ক?!!
অনেক কথা হল। ওরে সারারাত মেসেজ পাঠাইলাম, সে ও রিপ্লাই দিল।
gf আছে?
-নারী, বাড়ি আর গাড়ি, এই তিনের সাথে আমার আজীবন আড়ি
চলে গেলাম। ওরে টিঠি লিখে যা আছে কপালে নাম নিয়ে পোস্ট করে দিলাম। উত্তর মনে হয় দিছিল। সত্যি ভুলে গেছি,
এরপর ওরে ফোন দেই। আমি একশ কথা বলি। সে আগের মতই নরমাল। একদিন বলেই ফেললাম, তুমি কি আসলে বুঝতে পারছ, আমি তোমার প্রেমে পড়ে আছি? তোমার জন্য আমার অনেক অনেক অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে পারতেছিনা। প্লিজ তুমি কি বলবা, তুমি কি আমাকে পছন্দ কর?
ও ততদিনে বুঝে গেছে। যদিও সরাসরি হ্যাঁ না কিছু বলেনাই। বেচারা বিপদে পড়ে আমতা আমতা করতে লাগল। বল্ল, দ্যাখো সিঁথি, আমি সত্যিই এইভাবে কখনো ভাবি নাই। আমরা তো ছোটবেলার বন্ধু।
এক দুই বার বাসায়ও গিইয়েছিলাম। একবার বলেছি, তুমি কি আমার হাতটা একটু ধরবে?
ও ধরেনি।
আমি পাগলামি করলেও সে তার বন্ধুত্বের সম্মান রেখেছে। কখনো আমাকে হার্ট করে কিছু বলেনি। আমি ফোন করতেই থাকতাম, করতেই থাকতাম। ফোন ধরলে চিৎকার করতাম। ওর জন্মদিনে পেত্নীর মত (মানে জমকালো) সেজে ওকে ফোন দিলাম। আমার রুম মেট আমার পাগল দশা দেখে একদিন ওর সাথ ফোনে কথা বল্ল। বল্ল, ভাই ও তো পাগল হয়ে যাচ্ছে আপনার জন্য। কিছু বলেন।
তবুও সে প্রফে ফেল করল, আর আমি পাশ করলাম।
বুঝলাম, আমার কাছে পড়ালেখার কম্পিটিশনটা এতই বেশি জরুরী, যে, আমি ওর কাছে পরীক্ষাতে হেরে যেতে পারবনা। ডাক্তারদের লাইফ সারাজীবনের পড়ালেখা। ও যদি কোন পরীক্ষায় আমার চেয়ে বেশি নাম্বার পায়, আমি ওকে খুনই করে ফেলব
তারপর একদিন কিভাবে কিভাবে যেন মনের ভিতর পরিবর্তন হতে থাকল। বলে দিয়েছি। সে না করেছে। আমার সব রুদ্ধ আবেগ ঢেলে দিয়েছি। আমি আর আগাতে চাইনা। ওকে এখন যেতে দেই। আমিও মুক্ত হই। এই সম্পর্কের ভার আমি আর টানতে পারছিনা।
চোখ মুছে বই নিয়ে বসলাম। প্রতিদিন পড়ালেখা করি। ডুবি, ভাসি। শান্তি পাই।
মাস তিনেক পর হঠাত আমি অকে ফোন করলাম। কারণ আমার ওকে সব বলে দেয়া উচিত। বল্লাম, আমি আর তোমাকে ফোন করবনা। সব ডায়রি (যেগুলোতে আমার চোখের জলে ভাসা কাহিনী ছিল) ওর চিঠির উত্তর আমি পুড়িয়ে ফেলেছি। সত্যি পুড়িয়েছিলাম। বল্লাম, আমার মনের চিকিৎসা আমি নিজেই করেছি
ও চুপচাপ শুধু শুনল।
আমি একবারে ফাইনাল প্রফ পাশ করলাম। এটা অনেক কঠিন। ইন্টারনী শুরু করলাম।
আমি ওকে ভুলে গেলাম।
তখনকার অনুভূতি পাগলামী কে যদিও দগদগে ঘা মনে হয়, তবুও এইটাই আমার প্রেমের গল্প। জীবনেও এই কাহিনী আমি ভুলে যাবোনা। এখনো কোন কারণে আমার হাজবেন্ডের সাথ দুই একদিন আমার মন কষাকষি চলে, আমি ওকে স্বপ্নে দেখি। দেখি, আমি ফোনে কথা বলছি, এত চাচ্ছি যেন সে আমার সাথে কথা বলুক, কিন্তু ও খুব দায়সারা হু হ্যাঁ বলছে। ফোন রাখে দিচ্ছেনা, তবু বুঝতে পারছি, ও আমার সাথে একদমই কথা বলতে চাচ্ছেনা
২য় খন্ড
---------
আমার তখন মেডিসিনে প্লেসমেন্ট। জাকির স্যারের ইউনিট। মানে ইউনিট ওয়ান। অসম্ভব কড়াকড়ি। রুগী ভর্তির দিন হোক বা এমনি সাদারণ দিন, অনেক অনেক কাজ। সকাল আটটা থেকে ওয়ার্ডে যাই। রুগী দেখে যাই ওয়ার্ডের সেমিনার রুমে। দেড় দুই ঘন্টা ধরে মর্নিং সেশন চলে। নতুন কেস প্রেসেন্টেশন, রুগী কিভাবে পরীক্ষা করে দেখা যায়, নতুন নতুন টপিক। সে এক চাঞ্চল্যকর অবস্থা। যদিও আমি মাত্র ইন্টার্ন, তবু নিজেই কয়েকটা কেস প্রেজেন্ট করে ফেললাম। একদিন প্রফেসর জাকির স্যার (সিনিয়রদের) বলেই বসলেন, দ্যাখো তোমরা এই ভাবে ওর মত কনফিডেন্টভাবে প্রেজেন্ট করতে পারলেই (2nd part) পাশ।
আমার খুশি দেখে কে। স্যারের মহা ভক্ত হয়ে গেলাম। নিজেকে আগে থেকেই ছেলেদের সমকক্ষ ভাবতে পছন্দ করতাম্ আর এখন পরিশ্রম করা বহুগুণে বাড়িয়ে দিলাম।
রুগী ভর্তি দিনগুলিতে ডিউটির সময়ের বাইরেও ওয়ার্ডে পড়ে থাকতাম। নিজের গরজে অন্যের প্রেজেন্টেশন রেডি করে দিতাম। এক পৃষ্ঠা ডেভিডসন পড়ে এসেও এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতাম স্যারদের, ওনারা মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকত। এই জিনিস কোথায় পেলা?
ফিফথ ইয়ারের পিচ্চিরা ঘুরঘুর করলে ওদের জড়ো করে পড়াতে শুরু করতাম। বা আসতে যেতে লাগিয়ে দিতাম, ১৩ নম্বরের রুগীর heart sound শুনে এসে বলো কি কি পাও? ১০ এর রুগীর হাতের আঙ্গুল গুলি দেখেছ?
পিচ্চিরাও আমার পিছনে ঘুরঘুর করত। আপু পড়ান পড়ান।
তখনকার মেয়ে ইন্টার্নরা কখনো ছাত্রদের পড়াতো না। আমাকে অনেকে মনে রেখেছে এইজন্য। এখনো ফেসবুকে আমাকে ট্যাগ দিয়ে পোস্ট দেয়, আপুর কাছে প্রথম রুগী দেখা শিখেছি।
ডিউটি রুমের টেবিলে প্রতিদিনের নতুন কড়কড়া পত্রিকা পড়ে থাকত সারাদিন, কারোই সেটা পড়ার ও সময় হোতোনা।
এমন কর্মময় একটা সময়ে আমাকে ম্যা ফোন করে বাসায় আসতে বল্ল। আমাদেরই এক অনেক দূরের লতায় পাতায় আত্মীয়ের ছেলে ডাক্তার। সে পাত্রী খুঁজছে। মনু ফুপুর মেয়েও ডাক্তার? তাইলে আর বাইরে দেখার দরকার কি? ওরা আমার ছবিও দেখেছে। এখন সামনা সামনি দেখতে চায়।
আমি বাসায় আসলাম। শুক্রবার সকাল সকাল গোসল করে আমার মামাতো বোন আর দুলাভাইয়ের সাথে আরেক ভাইয়ের মেগা-শপে গেলাম। শহরে আমার ভাইদের বড় বড় দোকান আছে।
ছেলে বলেছে, বাসায় দেখবেনা। দোকান টোকান হলেই হয়। পাত্র আর তার বড় বোন এসেছে। বর বোনের মাথায় ইয়া ঢাউশ একটা রংচঙ্গা ক্লিপ কিভাবে যেন লাগানো। আর মুখটা এমন করে রেখেছে, যেন দোকান বা দোকানের জিনিস, আকাশ বাতাস বা অক্সিজেন, কোন কিছুই তার পছন্দ হচ্ছেনা।
আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কোন সাবজেক্টে পড়ি?
আমি বুঝলাম, এই মহিলার ডাক্তারী পড়া নিয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান নাই। আমি বল্লাম, আমি সার্জারি তে ক্যারিয়ার করব, এটাই আমার স্বপ্ন। সে বল্ল, গাইনীতে করা যায়না? মেয়েরা তো গাইনী পড়ে। আমি বল্লাম, না আমার সার্জারি ভাল লাগে। আমি সার্জারিতেই পড়ব। তবে চাইলেই তো আর সার্জন হওয়া যায়না। দেখা যাক!
ছেলেটা ও দেখি আমার মতই দোকানের জিনিস্ পত্রের দিকে বিরাট মনোযোগ। বেশি লম্বা না। সরু সরু পাতলা পাতলা খোঁচা খোঁচা টাইপ চুল। চোখে চশমা পরা। ফুলহাতা শার্ট পরা।সাদা রঙের। আমি হাইট টাইট কিছুই ভাবছিলাম না, ভাবছিলাম, চশমা পরা একটা ছেলেকে বিয়ে করব? এটা তো কখনই ভাবিনাই।
একজন জিজ্ঞেস করল, ছেলের সাথে কথা বলবি?
আমি সরাসরি হ্যাঁ না বলতে পারলাম না, বল্লাম, আমার কোন অসুবিধা নাই (বলতে)।
সে ভেবেছে, আমি কথা বলতে চাইনা।
ঘোরের মধ্যে বাসায় আসলাম। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমার সাথের মামাতো বোন জিজ্ঞেস করেছে, ছেলে কি পছন্দ হয়েছে? আমি হু হ্যাঁ কিছু না বলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। আমার সমস্ত শরীর কাঁপছিল। আমার বোনটাও চোখ লাল করে কান্না শুরু করল। আমাদের এই খানদানী কান্নায় আমার মা ও যোগ দিল। আমি বলতে চাচ্ছিলাম, যদি আমার মা-র পাত্র পছন্দ হয়, তাহলে আমি রাজি।
আচ্ছা ছেলের বাবা কোত্থেকে আসল, মনে করতে পারছিনা, বোধহয় বিকালে আবার বাবাটাও এসেছিল। পাত্র আসেনাই। তখন স্বাভাবিক গলায় কথা বলেছি।
ওরা চলে গেল। বল্ল জানাবে।
আমি বাসায় একদিন আরো বেশি থাকলাম। কিছু জানায়না। চলে আসলাম।
এইদিকে ওয়ার্ডে চরম একটিভ সিঁথি নাই তিন দিন।। অলরেডি রটে গেছে সিঁথির বিয়ে। কাওকে দাওয়ত দেইনাই, এই বিষয়ে কিছু বলিনাই, কেউ সরাসরি কথা শুরু করতে পারছেনা।
আমি তখন জানতা চাইলাম, আচ্ছা ছেলের ডিগ্রী কি? সে নাকি সরকারি চাকরিতে অন্য কোথাও পোস্টিং না পেয়ে গাইনীতে জয়েন করেছিল। এক বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাইয়া, পিজিটি কি?
ভাইয়া হাসতে হাসতে বল্ল, এইগুলা কিছু না। কেন? কে বলছে, সে পিজিটি?
এত খারাপ লাগছিল, যে এমন একটা বাইট্টা, চশমু, ডিগ্রী ছাড়া মানুষের কাছে নিজেকে বিচারের ভার দিয়েছি, সে নিজেও জানেনা সে নিজে কি,আর আমি কি
আরো দিন দুই গেল। মা বল্ল, তুই আবার মন খারাপ করিসনাই তো? ওরা তো সরাসরি কিছু বলছেনা। মনে হয় 'না'। আর ভাসা ভাসা শুনলাম, ছেলের বোন বলেছে, মেয়ের মুখ বড়।
আমি অবাকের ওইপাড়ে চলে গেলাম। মুখ বড়? আমার যে মুখ বড় না কি, এইটা তো ওরা আগেই জানে। এইভাবে বলার মত বাজে নাকি আমি দেখতে?
রাগ হোলো। কষ্ট পেলাম।
তারপর কষ্টটা বার বার নিজেকেই আঘাত হানতে লাগল। আমার এত পরিশ্রম করে অর্জন করা আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদা কোথাকার কোন চকচকা ক্লিপ পরা অশিক্ষিত কদর্য মহিলা আর তার বোবা ভাই ভেঙ্গে গুড়া গুড়া করে দিল। হঠাত আমি বন্ধুহীন হয়ে গেলাম। অন্যের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখতে শুরু করলাম। জানি সবই শুনতে খুব হাস্যকর শোনাবে, কিন্তু আমি যেন একদম অস্তিত্ব হীন হয়ে যেতে থাকলাম।
মনে হতে থাকল, সব ছেলেরা আর তাদের বোনেরা আমাকে এইভাবেই দেখছে। আমাকে অনেক ছলা কলা করে এখন একটা বর জুটাতে হবে।
হয়ত এই ভারী ভারী বইয়ের বিদ্যা আর জ্ঞানের জায়গা এই বই পর্যন্তই। ওয়ার্ড ভর্তি এইসব রোগ ভরা মানুষগুলো আসলে আমার জীবনের কোন অংশ না। ছোটদের শিখিয়েও লাভ নাই, কারণ, সেও আমার প্রতিযোগি।
আমাকে দেখে যে টাকা দিয়ে গিয়েছিল, সেই টাকা দিয়ে বিসিএস গাইড কিনলাম। হাঁচড়ে পাঁচড়ে অস্তিত্ব নিয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা।
আর যখন সেই চেষ্টা অর্থহীন মনে হত, কান্না পেত, ভিতরটা জ্বলত,তখন অদ্ভুত শিশু সুলভ একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খেত, আমাকে কেউ ভালোবাসেনা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন