শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৫

আমার অনেক ঘুম দরকার

কিছুদিন ধরে ভালোরকমের বিষণ্ণতায় ভুগছি। ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতে পারিনি। এবারের বিষণ্ণতাটা চোরা-গুপ্তা। অন্যবারের মত বিরক্তি, রাগ বা বিধ্বংসী কোন আবেগ বয়ে আনেনি, তাই ধরতে পারছিলামনা আসলে সমস্যাটা কি। বুধবার রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত আমি বুঝতে পারিনি আসলে কি ঘটছে। সাড়ে এগারোটায় ধরতে পারলাম আমি চরম বিষণ্ণতায় ভুগছি। এবং আমি বুঝে গেলাম এই বার আমার জন্য এখানথেকে বের হয়ে আসা মোটামুটি অসম্ভব একটা ব্যাপার। আর শুক্রবার। এখন রাত বার টা ১৮। এখনো বিষন্নতা নিয়েই আছি। বের হয়ে আসিনি। পথ খুঁজে পাইনি  অথবা চেষ্টাও করিনি। তবে লেখা যখন শুরু করেছি, বুঝতে পারছি, এর মধ্যে আমি আর থাকতে চাচ্ছিনা। এবং, আমি তো আমাকে চিনি, আমি আজ একটা উপায় বের না করা পর্যন্ত লেখা থামাবো না। অথবা আরেকটু অন্যভাবে বললে, লেখা শেষ হতে হতে আমি আজই একটা উপায় বের করে ফেলব।

হাহাহা, নিজের উপর আমার চরম বিশ্বাস। নিজেকেই আমি সবচেয়ে ভালোবাসি আর এত ভালোবাসার ধারে কাছে অন্য কেউই নেই।

নাহ মন খারাপের চোটে আর কিছু লিখতে পারছিনা। আমি বোধহয় সেই দিন গুলিতে ফেরত যাচ্ছি, যখন পাগল হয়ে বা সেজে আমি পিজি হাসপাতেলের মানসিক বহির্বিভাগে দেখাতে গিয়েছিলাম। আট নয় বা বারোতলায় প্রফেসরের রুমে ক্লাস হচ্ছিল যখন আমার হিস্ট্রি নিচ্ছিল স্যার, প্রায় চল্লিশজন স্টুডেন্ট, আমাকে জিজ্ঞেস করল স্যার, আপনি কেন এসেছেন?
আমি বললাম, আমি খুব কষ্টের মাঝে আছি। সারাখন খুব মন খারাপ থাকে, বাসায় যতখন থাকি, কাপড় ধুই। এর মানে এমন না, আমার শুচিবায়ূ আছে,মনে হয় এটা ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই। সারাদিন রাতে গাদা গাদা কাপড় ধুতে থাকি। আর একদিন কি ভাবি, আরেকদিন সেটা মনে করতে পারিনা।
আমার চোখ দিয়ে আপনা আপনি পানি পড়ছে। আমি নিজেও জানিনা কেন কাঁদছি। মনে হচ্ছিল কে কি ভাবে আমার তাতে কিছু আসে যায়না।

আপনি কি করেন?
আমি ডাক্তার।
কি করেন? কোথায় আছেন?
আমি  কিছু করছিনা এখন। গাইনী তে পার্ট ওয়ান পাশ করেছি।

সারা রুম ভর্তি এতজন মানুষ, কিন্তু স্যার আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় কথা বলছেন।
আপনার  কি মনে হচ্ছে এখানে এসে আপনি কোন উপকার পাবেন?
হ্যাঁ। আমার মনে হচ্ছে আমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি, তাই এখানে এসেছি। আমার সাহায্য দরকার। আমি আমার অবস্থা থেকে বের হতে পারছিনা

এত কষ্ট হচ্ছিল। এখন যে লিখছি, এখনো কষ্ট হচ্ছে।
আমার জন্য একজন কাউন্সিলর ঠিক করা হল। আরফা হক। ফরসা মিষ্টি দেখতে, দাঁতগুলো খুব সুন্দর, আমার অনেক ছোট। আমি আপনি করে কথা বলছিলাম। কাগজ পেন্সিল নিয়ে মুখোমুখি চেয়ারে বসে সে কথা নোট করছিল। খুব এক্সপার্ট না সে, ছাত্র, কিন্তু আমি জানি, সে রুটিন কাজ করছে। আমি বাসে করে ভীড় ঠেলে একা একা এই ব্লক সেই ব্লক ঘুরে বহু কাহিনী করে এখান পর্যন্ত এসেছি। কাউন্সি্লিং-এ কি কাজ হল,আমি জানিনা, আমার চেষ্টাকে আমি বাহবা দিতে শুরু করলাম। দুই দিন গিয়েছি। তারপরের সপ্তাহে আমি ময়মনসিংহে চলে গেলাম। ট্রেনিং এ ঢুকলাম, কিন্তু সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পারছিলাম না। আমি সারাখন মনমরা হয়ে থাকতাম, মাঝে এক দুই দিন যাইওনি হাসপাতালে। নূরী আপু, রিংকি আর লোপা আমাকে ধরল। নূরী আপু বল্ল, কি সিথি,ট্রেনিং কি আবার ছেড়ে দেয়ার চিন্তা করছ নাকি? তোমারতো হিস্ট্রি আছে ট্রেনিং ছাড়ার। ট্রেনিং কিন্তু ছাড়বা না। তুমি ভাই পাগল মানুষ।পাগলামী কর, কোন সমস্যা নাই, কিন্তু ট্রেনিং ছাড়বা না।
আমি ধীরে ধীরে হাসিখুশি হতে থাকলাম। ট্রনিং করতে থাকলাম।আমার কাপড় ধোয়া রোগ ভালো হল।

বুধবার রাত সাড়ে এগারোটায় বুঝতে পারলাম, আমি এখন এমন একটা জায়গায় আটকে গেছি, যেখান থেকে কোন এস্কেপ প্ল্যান নেই। আমার যাওয়ার জায়গা নেই, এমন না। আমি মানসিক ভাবে বাঁধা পড়ে গেছি। আমার সামনে দেয়াল। এইবার আমি আবার পিছনে যাওয়া শুরু করব। দেয়াল ভাঙ্গতে পারব না। কে জানে, এই ডেড এন্ড এর গোলক ধাঁধাতেই আবার ঘুরপাক খেতে থাকব।

প্রায় আটমাস থেকে আমি বৃহস্পতি বার নাইট ডিউটি করছি। শুক্রবার আটটায় আমাকে বাসায় নিয়ে আসার জন্য প্রাইভেট কার অপেক্ষা করে। কিন্তু শুক্রবার সকালে আমার বাসায় ফিরতে ইচ্ছা করেনা। মনে হয় গাড়িটা নিয়ে একদিক থেকে একটু বেড়িয়ে আসি, আজ আর বাসাতে যাবোনা। আচ্ছা যাবনি, একটু পরে যাই। আজ সকালেও ইচ্ছা হচ্ছিল হসপিটালের পাশের মাঠে গাড়িটা কিছুক্ষন ঘুরাতে বলি কারণ ছাড়াই। বলিনাই। কানে ইয়ারফোন গুজে দিয়ে বাসার উদ্দেসশ্য রওনা দিলাম। আকাশ বাতাসও অসহ্য লাগছিল। গানগুলোও।গাবতলী যখন পার হচ্ছিলাম, আমার রীতিমত বুকে ব্যথা করছে।

একদিন ফেসবুকে মেরুনকে বলেছিলাম, আমার বাসায় যেতে ইচ্ছা হচ্ছেনা। আমি ডিউটিরুমের চেয়ারে বসা।
ও বল্ল, যা আপু, বাসায় যা।

বাসায় এসে কাপড় না বদলেই ঘর ভর্তি আধাভেজা কাপড় বারান্দায় মেলে দিলাম। ছোটজন উঠে গ্যাছে,ওকে খেতে দিলাম, আমিও নাস্তা করলাম। সকালে বুয়া এসে নাস্তা বানিয়ে গেছে, থালাবাটি ধুয়েছে আর ঘর মুছেছে, কিন্তু সারা বাসা লন্ডভন্ড। কোন জিনিস জায়গামত নেই। ঘর গুছাতে গুছাতে তিনটা বাজল। রোবটের মত কাজ করে যাচ্ছি। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা। কাল রাতে একটা মরা বাচ্চা ডেলিভারী করিয়েছি। কাপড়টা অন্তত বদলানো উচিত ছিল।তাও মনে চাচ্ছেনা। বাচ্চারা ভয়ে আমার কাছেও আসছেনা। ওদের একবার কিছু বললে শুনতেও চাচ্ছেনা। আমার হুট করে রাগ লাগছে। হুট করে কান্না পাচ্ছে। পিঠ ব্যাথা করছে। একটু বিশ্রাম নিতে পারছিনা। ইচ্ছাও করছেনা। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা আমার কিচ্ছুই না। সন্ধায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতে গেলাম। তাও ভালো লাগছেনা কিছু।

কই সিঁথি তোমার সমাধান?
আমি কি আবার যাবো বহির্বিভাগে?
ওজন কমানোতে মনোযোগ দিব?

এটা হাস্যকর সিঁথি, প্লাসেন্টার স্টেরয়েড হরমোনের জন্য তুমি এমন অদ্ভুত আচরণ করতে পারোনা। and those hormones? they dont give you a shit! এখন পড়তে হবেনা। পড়তে হলে গল্পের বই পড়। আর এত এত কাহিনী না করে এত বড় ব্লগ না লিখে তুমি চ্যাপ্টার টা শেষ করতে পারতে। হাস্যকর। তোমার কোন বিষণ্ণতা নেই। বাসাটা এলোমেলো থাকলেই হত। কেন গুছাতে গেলে? এখন মনে হচ্ছে সময় নষ্ট করেছ? এখন ঘুমাও সিঁথি। আর সারাক্ষণ মনে মনে কথা বলা বন্ধ কর। you need to sleep, sleep like a baby ...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন