রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৬

টেকনিক



জুবিন হঠাত বলে উঠল, বুঝেছ মিথি, এই হোস্টেল লাইফে এসে যে জিনিসটা আমি শিখলাম, তা হল, তোমাকে প্রতি মুহূর্তে অনেক ‘টেকনিক্যাল হতে হবে।
আমরা ক্লাস শেষে হোস্টেলের ডাইনিং-এ এসেছি।ভাত খাব। দুপুর দেড়টা বাজে। আজ আমার হোস্টেল লাইফের দ্বিতীয় দিন।চোখ বড় বড় করে সব দেখছি।সারি সারি পাতা বিছানায় ছোট ছোট সংসার-ওলা কমনরুম। সবাই ধুন্দুমার পড়া লেখায় ব্যস্ত। আমি এসেছি মাইগ্রেশন করে ছাব্বিশ দিন পর। জুবিন আমার কলেজের বন্ধু।চারতলা কমনরুমে ওর পাশের চকিটা আমার জন্য সে বুক করে রেখেছিল।
ক্যাম্পাসে আমি পৌঁছেছিলাম বিকালে। বেয়াদপ রিক্সাওলা আমার রিক্সাটা ইচ্ছা করে বয়েজ হোস্টেলের গেটে থামিয়েছিল। আমার আব্বা সেইরকম খেপে গেল।খেপে গিয়ে তুই তোকারি শুরু করল। কি রে ব্যাটা তুই শুনিসনি, লেডিজ হোস্টেল বলেছি?কেন এখানে আসলি?
লোকটা কেন এমন করেছিল? বয়েজ হোস্টেলের মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছিল।
আব্বা আমাকে লেডিজ হোস্টেলের গেটে নামিয়ে কিছুক্ষণ ছেড়া-ময়লা-পুরান সোফা-ওলা অন্ধকার- অন্ধকার গেস্টরুমে বসে ছিল। তারপর চলে গেল। আমি কোনোদিনো বাসার বাইরে থাকিনি।
পরদিন সবার সাথে বসে লেজ ধরে একটা পরীক্ষা দিলাম। আইটেম। ফিমার। আমি উল্টা করে ফিমার ধরে ছিলাম আর তোতলাতে তোতলাতে কি বলছিলাম নিজেও জানিনা।আবদুল্লাহ স্যার মুখে কিচ্ছুটি না বলে হাত বাড়িয়ে আমার কার্ড ফিরিয়ে দিয়েছেন। সেই কার্ড নিয়েই প্রেমে ছ্যাকা খাওয়ার মত চিকন চিনচিনে একটা অনুভূতি নিয়ে আমি ভালো মানুষের মত মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। জুবিন হয়ত লক্ষ্য করেছে।
ক্যান্টিনে অদ্ভুত ঝলমলে একটা আলো। লম্বা একটা হলরুম। মাঝে মাঝে পিলার। সবার শেষে দেয়ালে চৌকো কাঁটা অংশ।একটা কপাট ছাড়া দরজা। টেবিলে ইয়া ইয়া বিশাল সাইজের গামলা বসানো কয়েকটা। ডালের। জুবিন খাবার নেবার আগেই আমাকে বলে দিয়েছে, গ্লাসে ডাল নিয়ে নাও। একটু পর আর তলানি থাকবেনা। তাই ই করেছি।
আমি আসলে কোথাও গিয়ে খুব তাড়াতাড়ি সেখানে মিশে যেতে পারিনা। শিখিনি তখনো। কমন রুমের সবার সাথে কথা বলেছি, কিন্তু কারো চেহারা মনে নেই। এখন আসতে সময় ডাইনিং-এ ঢোকার পথেই একজন হেসে মাথে নেড়েছে, একদম রুপালীর মত দেখতে, কিন্তু সে রুপালীই কিনা আমি বলতে পাঢ়বনা। অদ্ভুত একটা অনুভূতিতে ভাসছি। এই জায়গাটাকে আমার নতুন ঠিকানা ভেবে উঠতে পারিনি এখনো। মনে হচ্ছে বুঝি বেড়াতে এসেছি। এখানেই আগামী কয়েক ব-ছ-র থাকতে হবে, এই কথাটাও নিজেকে এখনও সেভাবে বলিনি আমি। কিন্তু কথাটা মনের কোণে অল্প করে  উঁকি দিচ্ছে, তাতেই দমবন্ধ-মত লাগছে।    
চুপ করে আমি মানুষ জনের হৈ হট্টোগোল শুনতে থাকলাম। মাথা নিচু করে টেবিলের দিকে তাকিয়ে। যারা আজ আইটেমে পাশ করেছে ওরা হেসে হেসে গল্প করছে। ঠিক করেছে, সবাই মিলে সেলিব্রেট করতে যাবে।াজ বিকালে সবাই তাজহাটের রাজবাড়ি দেখতে যাবে।
জুবিন সারাটা-খন আমার পাশে পাশে আছে ।বলছে, খেতে পারছ তো?
-হুম।
ওদের রান্নাটা একটু অন্যধরণের। অনেকে সহ্য করতে পারেনা প্রথম প্রথম।
-হুম।
খারাপ লাগছে তোমার?
-না না।
তাও ভাল, আজ ঢেড়শের ঝোল দিয়ে মাছ রাধেনি। ওইটা খাওয়া যায়না
-তাই?
আমি খাচ্ছি। ডাইনিঙের এত ঝলমলে আলোর উৎস খুঁজছি। দুইপাশে সারি সারি জানালা। ঘোলাটে কাঁচ ভেদ করে এত আলো ঢুকেছে?
খেয়েদেয়ে উপরে যাবো। গল্প চলবে বা ঘুম। কেউ কেউ ক্লাসের নোটপত্র বা লেকচার এখনই গুছিয়ে ফেলবে। গোসলের সিরিয়াল ধরতে হবে। কমনরুমের সাথে কোন বাথরুম নেই।চারতলার অন্য রুম গুলোর বাথরুমে সিরিয়াল দিতে হয়।অনেক ঝামেলা।
জুবিনের কথায় সচকিত হলাম।
‘বুঝেছ মিথি, এই হোস্টেল লাইফে এসে যে জিনিট টা আমি শিখলাম, তা হল, তোমাকে প্রতি মুহূর্তে অনেক টেকনিক্যা্ল হতে হবে’
মানে?
জুবিন আমাদের সামনে রাখা একটা হাতল ছাড়া টিনের জগের দিকে দেখিয়ে বল্ল, ধর, এই জগটা দেখো। হাতল নাই। পানি দিয়ে সম্পূর্ণ ভরা। এত ভারি হাতল বিহীন জগ  থেকে ভাবে পানি ঢেলে খাবো? সেইটাই হল টেকনিক।
জুবিন নানা কয়দা ক্যারিকেচার করে এক হাতেই সেই জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে ফেল্ল। ওর কান্ড থেকে হো হো করে হাসতে থাকলাম। জুবিনও হাসছে। মাঝে মাঝে মেয়েটা এমন সব অদ্ভুত কান্ড করে হাসাতে পারে!

জুবিন বল্ল, তাজহাটে যাচ্ছে সবাই।
হুম।তুমিও যাও।
তুমি যাবানা?
তোমরা যাও সেলিব্রেট কর। আমার যেতে ইচ্ছা করছেনা।
জুবিন প্রশ্নবোধক চিহ্ন মুখে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। জানতে চাচ্ছে বোধহয় আমার মন খারাপ লাগবে কিনা? আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, না, না, আমার খারাপ লাগবেনা। তোমরা অবশ্যই যাবা।
আমাদের মাঝ থেকেই একেকজন একেক ক্ষেত্রে দারুণ কিছু করে ফেলবে একদিন, হিংসা, দুঃখ হতাশার ঊর্ধ্বে উঠে বন্ধুর মত তাকে বাহবা জানাতে শেখার টেকনিকটাও আমি সেদিনই শিখে গিয়েছিলাম।  


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন