শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০১৬

গরুর হাটে একদিন



পৌনে তিনটায় রওনা দিয়ে সাড়ে চারটার দিকে আমার বাসায় থাকার কথা,কিন্তু তখনো আমি হেমায়েতপুর।সামনে- পিছনের একটা গাড়িও নড়েনা।
আজ (বুধবার)ড্রাইভার বাড়ি যাবে, ছয়টায় তার বাস, সে ইতিউতি তাকাচ্ছে বারবার। বল্ল, আপু, ডানদিকে ঘুরায়ে বছিলা ব্রিজ ওইদিক হয়ে চলে যাই? এই দিকে গেলে দেরী হবে।

ভাকুর্তার রাস্তা। আমার বড়ই প্রিয়। বললাম- যাও।
কিন্তু তখনো জানতাম না, এটা ছিল আমার স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত
যাহোক, লক্কড়- ঝক্কর বলিয়ারপুর ব্রিজ দিয়ে আমার যাত্রা শুরু হল। মেঘে ঢাকা পথ ঘাট।ব্রিজ থেকে দেখি দূরে নদীতে কাত হয়ে থাকা খেয়া নৌকায় বসে আছে টকটকা আকাশী শার্ট পরা এক মাঝি, নিচু হয়ে বসে নদীতে পানি ছিটাচ্ছে।
গাঢ় আকাশীর সাথে চারদিকের গাঢ় ছাই -- কি যে মারাত্মক সুন্দর লাগছিল বলার না। মাঝির বৌকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম, আজকের দিনে এই শার্টটা ধুয়ে শুকিয়ে কাজে যাওয়ার আগে মাঝির হাতে ধরিয়ে দিয়েছে বলে। মাঝি হাত বাড়িয়ে নিয়েছে বটে কিন্তু ভুরু কুঁচকে বলেছে, ‘এইডা কি দিলা? পিন্দন যায়না’ বৌ অত কথা না বাড়িয়ে মিথ্যা করে বলেছে ‘আর ডি ভিজা’  
নৌকাটা ফেলে এসেছি অনেক পিছনে, আঁকা বাকা পথ ঘুরে ঘুরে এসেছি ওয়াশপুর গার্ডেন সিটি, পুরো জায়গাটা কাশফুলে ছেয়ে আছে। আহা কি সুন্দরটাই লাগছে।
এরপর বছিলা ব্রিজ। শেষ। আমার আরাম শেষ। জানতাম না, এইখানে হাট বসে।

আমি জীবনেও গরুর হাটে যাইনি।
মেরুন, মু্বিন,‌ বাপি, ছোটোখালু, সৈকত, ছোটমামা, রাসেল ভাই, মেজমামা খুব ঘটা করে সার্কিট হাউজ মাঠের হাটে যেত। ফিরত মহা আনন্দ করতে করতে। আমরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনতাম, কতগুলো গরু দেখা হয়েছে, কেমন কঠিন দামাদামি হয়েছে, কতখানি পথ ঘুরে ঘুরে হেঁটে আসতে হয়েছে। গরু, খড়, ভুষি, দড়ি, লাঠি, টর্চ লাইট, বস্তা, ভাতের মাড়, গামলা নিয়ে বিরাট হুলুস্থুল শুরু হয়ে যেত। ঈদ শুরু হয়ে যেত। উঠানের আমগাছের সাথে রাসেল ভাই গরু বেঁধে দিত, এখন আমরা উঠান কিভাবে পার হই? শুরু হয়ে যেত মেহেদী লাগানোর ধুম।

গরুর হাটের জ্যামে বসে কিছুখন এই পুরান দিনের কথা মনে করলাম।হাটে যারা গেছেন, জানেনই, হাট কিভাবে বসে,-- আমি কখনো যাইনি, তাই বলছি, প্যান্ডেল করে রাস্তার দুই ধারে সারি সারি গরু বাঁধা থাকে খুঁটির সাথে, এইটাই গরুর হাটথকথকা কাঁদা চারদিকে, লাখো লাখো মানুষ। রাস্তা ঘেঁষে মানুষ আর গরু যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। তীব্র জ্যাম। বসে বসে গরু, গরুর মালা, ঘাষ, খড়, কাঁদা দেখতে দেখতে রাত নেমে গেল। ইতিমধ্যে আমার ফোনের সব গান শোনা শেষ, কান ব্যথা হয়ে গেছে গান শুনতে শুনতে। কিন্তু গাড়ি আর চলেনা। বিরাট বিরাট গরুর তেড়ে আসা দেখে ভয় লাগছে, ঝুম বৃষ্টি শুরু হল।মাইকে শুনছি,
‘ক্রেতা সাধারণ, আপনারা অযথা এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি না করে, রাস্তায় জ্যাম না বাধিয়ে আমাদের হাটে আসুন, এখানে কৃষকের যত্নে পালিত নানার জাতের নানান সাইজের গরু ছাগল আছে’
‘লালমাটিয়া থেকে আগত জামাল হোসেন, আপনি যেখানেই থাকুন, আমাদের মাইকের কাছে আসুন, আপনার ছেলে সজীব এখানে আছে’
‘ক্রেতা ও বিক্রেতা ভাইয়েরা, বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে গরু বাঁধবেন না, বৈদ্যুতিক খুটির সাথে গরু বাঁধা নিষেধ, নিজে সেফ থাকুন, অন্যকে সেফ রাখুন’

খুবই দরকারী ও সাধারণ কথা, কিন্তু ক্লান্তি, বিরক্তি রাগ সব মিলে পাগল পাগল লাগা শুরু হল, এই দিকে বাচ্চারা অপেক্ষা করতে করতে কান্না কাটি শুরু করেছে মায়ের জন্য, ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে।
কি বুঝে ড্রাইভার রেডিওতে খবর ছেড়ে দিল। কাল কি বৃষ্টির মাঝে রেডিও খুলে কেউ ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তির খবর শুনেছিলেন? ওর মাঝে আমার কথাও ছিল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন