ঘাম মুছতে মুছতে বললেন
পরাণ ঘোষ।
জয়নুল হোসেন শুনেছেন
কথাটা।
বোতল থেকে পানি ঢাললেন সময় নিয়ে। চকচকে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার কাঁচের গ্লাস।
নিজেই ধুয়েছেন জয়নুল।বাসায় ফ্রিজ নেই, নষ্ট হয়ে দোকানে পড়ে আছে। থাকলে পরাণকে
ঠান্ডা পানি খাওয়াতে পারতেন, ভাবলেন।
গ্লাসটা পরাণের হাতে
দিতে দিতে বললেন, ‘নেন, খান। ঘেমে টেমে তো খারাপ অবস্থা! ফ্যান বাড়িয়ে দিব?’
পরাণ পানি হাতে নিল।
চুমুক দিল না। এই দিক ওইদিক মাথা ঘুরিয়ে দেখতে থাকল।
এত বড় বাসায় একদম একা
থাকেন?!
জয়নুল এবারো কিছু বল্ল
না। পরাণ কেন, শহরের সবাই জানে, তিনি একা থাকেন। তবু সবার একবার করে জিজ্ঞাসা করা
চাই, কেন একা থাকেন? একা থাকতে কি খারাপ লাগে কিনা। বাচ্চারা কই? জয়নুলের স্ত্রী
কই? কে রেঁধে দেয়? আসুখ বিসুখ হলে কি করেন? তারপর আবার প্রথম প্রশ্নে ফিরে যান-
ভাই, একদম একা কেমনে থাকেন? খারাপ লাগেনা?
জয়নুল ইদানিং এই
প্রশ্নগুলোর আর জবাব দেন না। হাসেন না, মাথা ঝাঁকান না, বিরক্ত ও হন না। ইচ্ছা করে প্রসঙ্গ পাল্টান না। আফসোস
করেন না।
কিছুই বলেন না।
আসলে খারাপ থাকতে
ইদানিং আর খারাপ লাগেনা। ভালো লাগে কিনা বলতে পারবেন না বুঝিয়ে।
পরাণ পানিতে অবশেষে
চুমুক দিল।
‘আরেক গ্লাস দিব?’
-না না
‘ঠান্ডা পানি হলে ভাল
হত না? দেখি ফ্রিজ টা ঠিক করাবো। যে গরম পড়েছে’
পরাণ বল্ল-‘ভাই আপনি
আজব মানুষ’
এইবার জয়নুল হো হো করে
হেসে দিল। ‘ভালো বলেছেন, পরাণ দা’
‘আজব ই তো, এইভাবে কি
জীবন চলে নাকি’
-‘চলবেনা কেন? খারাপ
আছি নাকি? দাদা, এইসব বাদ দেন, আপনাকে ডেকেছি, বাজারের দোকানের ব্যাপারে কথা বলার
জন্য’
জয়নুল সাহেব আমুদে
মানুষ, গপ্পি লোক যাকে বলে। উনার কাছে ক্রিকেট, বাজার, এস-এস-সি র ফল, চুরি-ডাকাতি-রোড
এক্সিডেন্ট সব খবর আছে। উনি নানান ভঙ্গিমায় নানান ফ্লেভার দিয়ে গল্প করতে পারেন।
সময়টা কেটে যায়। বাজারে পরাণের দোকান নিয়ে ঝামেলা চলছে উনি জানেন, ডেকেছেন এই
ব্যাপারে নিজের কিছু বুদ্ধি দেয়ার জন্য। জয়নুলের দরকার নেই বোধহয় এই বিষয়ে নাক
গলানোর, তবু।
পরাণ আটকে গেলেন।
ঘন্টা দুই চলল চুলচেরা বিশ্লেষণ। এর মাঝে জয়নুল তাকে চা বানিয়ে খাইয়াছেন, ঘরে
বিস্কিট আর কলা ছিল।
পরাণ মাথা দুলিয়ে
চিন্তা করতে করতে বিদায় নিলেন।
জয়নুল ধীরে ধীরে কাপ
বাটি গুলো পরিস্কার করলেন। বিছানাটা টান টান করে রাখলেন। দুপুর একটা বাজে। গোসল
করে খেতে যাবেন। বছিরের দোকানে মাস কাবারি চুক্তি আছে। আজ বুধবার। বছিরের ওখানে আজ
তেলাপিয়া পাওয়া যাবে। সাথে পাতলা ডাল। বছির বলেছিল, বাসায় দিয়ে যাবে প্রতিদিনের
খাবার, জয়নুল মানা করেছেন। দোকানে কোলাহলের মাঝে বসে খেতে উনার ভালই লাগে।
আজীবন এভাবে একাই
কাটালেন বলা যায়। মফঃস্বলে পরিবার পরিজন রেখে ঢাকায় থেকেছেন মেসে। নিজের কাজ নিজে
গুছিয়ে করেছেন, ঘর সংসারের ঝুট ঝামেলা তার স্ত্রী একা হাতে সামাল দিয়েছেন। দুই
ছেলে স্কলারশীপ নিয়ে আমেরিকা আর জার্মানি আছে। বড়জন বিয়ে করেছে, ওখানেই থাকবে ওরা। মা কে
নিয়ে গেছে, দেশে একলা থাকবে কি করে মা? আর ওদেরও মায়ের হেল্প দরকার।
রিটায়ারমেন্টের পর
একবার বড় ছেলের ওখানে গিয়েছিলেন, ভালো লাগে নি।
বিকালে কিছুক্ষণ
গড়াগড়ি করে উঠে পড়লেন জয়নুল।
আজ স্টেশনে যাবেন।
বাল্যবন্ধু জেনারেল প্র্যাক্টিশনার ডাঃ মিজানুর রহমানের চেম্বারে। পাশে চায়ের
দোকানে সন্ধ্যা অবধি ওখানে আড্ডাটা জমে ভাল
হেঁটে হেঁটে বাসায়
ফিরলেন। একটু হাঁটাহাঁটি করা তো ভালই এই বয়সে।
ঘুমিয়ে পরেছিলেন আজ
একটু আগেই। সাড়ে দশটায় ফোন বেজে উঠল।
ফিরোজার ফোন।
খেয়েছ? ওষুধ? চোখ
দেখানোর কথা ছিল? রান্নার একটা লোক রাখোনা কেন?
সংক্ষেপে উত্তর দেন
জয়নুল। “তোমাদের কথা বল”
“আমার কথা আর কি বলব?
এই আছি আর কি”
তার পর বলেন, তার হাঁটু
ব্যথা নিয়ে কি হুলস্থুল হচ্ছে ওখানে, হাঁটুতে কি কষ্ট। নাতনী কথা শিখছে। বাংলা
ইংরেজী মিশিয়ে কি অদ্ভুত করে কথা বলে। ছেলে বলেছে দিদা ডাকতে, কিন্তু ও ডাকছে ডীডা। মাছের দাম
এত্ত বেশি! যদিও মুখে তোলা যায়না। কয় দিন
ধরে পাঙ্গাশ খেতে মন চাচ্ছে কেন জানি
জ্যনুল হু হা করে
শোনেন। তেমন কিছু বলেন না।
তারপর সারা রাত কেন
জানি আর তার ঘুম আসতে চায় না।
বয়স বাড়তে থাকলে রাত জেগে
জেগে ঘুমের জন্য অপেক্ষা করা কি যে একটা উটকো ঝক্কি!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন